logo

   

সরকারের সহযোগীতার আশায় বসে না থেকে নিজেদের উদ্যোগেই কাজ শুরু করে দিতে হবে। - এম এ সবুর

Photo

এম এ সবুর । বাংলাদেশের আর দশটা সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান । বাবা ছিলেন কারাধ্যক্ষ, মা গৃহিনী । বাবার চাকরীর সুত্র ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার বেড়ে উঠা। অত্যান্ত মেধাবী এই ছাত্র শিক্ষকের ভুল সিদ্ধান্তের কারনে জন্য বিজ্ঞান শিক্ষা হতে বঞ্চিত হন । তিনি বাধ্য হন মানবিক বিভাগে পড়তে। এতে তার জিদ চেপে যায়, তিনি প্রমান করেন শিক্ষকের সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো । ১৯৮১ সালে এসএসসিতে এবং ১৯৮৩ সালে এইচএসসিতে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ন হোন। দুটি পরীক্ষাতেই তিনি "বোর্ড স্কলারশিপ" প্রাপ্ত। রাজশাহী ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে মাষ্টার্সের পর বৈচিত্রময় শিক্ষা জীবন শেষে এই উদ্দোমী,পরিশ্রমী ও মেধাবী মানুষটি ব্যাবসার চিন্তা করেন । তিনি একটি রেশম কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি এবং অনেক কষ্টে একটি ব্যাংক কে অর্থায়ন করাতে রাজি করান । একেবারে শেষ মূর্হুতে ব্যাংক তাকে ডেকে বলে, আপনি আগে ব্যাবসা শুরু করুন, অভিজ্ঞতা অর্জন করুন, তারপর আমরা লোন দেব । এ কথা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে তাঁর। যেন সমস্ত প্রচেষ্টায় পানি ঢেলে দেওয়া হয় । তিনি আহত হন, কিন্তু ভেঙ্গে পড়েননি । তার বাবা ছিলেন একজন সৎ, নিষ্ঠাবান কারাধ্যক্ষ। তার কাছে এমন উদ্বৃত্ত টাকাও নেই যে ছেলেকে ব্যাবসার জন্য দিবেন । আর সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় ব্যাবসার চিন্তা বাদ দিয়ে তিনি চাকরির চিন্তা করেন ।

একজনের কাছ থেকে মাত্র ৫০০ টাকা ধার করে ১৯৯১ সালে তিনি ঢাকায় পাড়ি জমান। প্রায় দেড় মাস চেষ্টার পরে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরী পান । কিন্তু কয়েক মাস চাকরী করার পর তার মনে হয় প্রতিষ্ঠানটি মানুষের সাথে প্রতারনা করছে । নীতিতে বাধে তার, তিনি চাকরী ছেড়ে দেন । সাহসী মানুষটি একবারও ভাবেননি কিভাবে চলবে তার জীবন। কিছুদিন পরে তিনি একটি গার্মেন্টসে দিন চুক্তিতে চাকরী নেন । অর্থাৎ কাজ করলে টাকা না করলে নাই । এখানে কাজ করেন প্রায় এক মাস । এরপর যোগ দেন ঈগলু আইস ক্রীমের “সেলস অফিসার” হিসেবে। এরপর আর তাকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সফলতা যেন তার পায়ে পায়ে এগিয়েছে। নিজের মেধা, পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা হয়ে গিয়েছে। তিনিই প্রথম উত্তরাঞ্চলে ঈগলু আইসক্রীমের বাজারজাত করেন। বাংলাদেশ অক্সিজেন করপোরেশন থেকে ড্রাই আইস দিয়ে নাইট কোচের ছাদে করে প্রথম ১৮২৬৫.০০ টাকার আইসক্রীম রাজশাহীর "বিস্কুট বিপনী"তে পাঠান। কয়েক দিনের মধ্যেই তা বিক্রি হয়ে যায়। তিনি অল্প দিনেই সেলস অফিসার থেকে বিভাগীয় প্রধান হন । মাত্র ১৮২৬৫.০০ টাকা দিয়ে শুরু করে ছিলেন যে আইসক্রীমের বাজার, তা আজ কয়েক কোটি টাকাতে দাড়িয়েছে।

এই সাহসী, উদ্যোমী, পরিশ্রমী, সৎ এবং আধুনিকমনস্ক মানুষটিকে ঘিরেই আমাদের রাজশাহীর এবারের সাক্ষাতকার পর্ব।



আমাদের রাজশাহী ডট কম :- আপনার পড়াশোনা সম্পর্ক কিছু বলুন।
এম এ সবুর:- বাবার চাকুরীর সুবাদে আমাদের পরিবারকে প্রায় পুরোদেশ ঘুরতে হয়েছে, আর সেই কারনেই আমাকেও দেশের বিভিন্নস্থানে পড়াশোনা করতে হয়েছে। যশোরের ক্যান্ট. স্কুল, ময়মনসিংহের গলগন্ড স্কুল, রংপুরের কারমাইকেল স্কুল অন্যতম। ১৯৭৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে ৭ম শ্রেনীতে ভর্তি হই। ১৯৮১ সালে এসএসসি এবং ১৯৮৩ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করি। ১৯৯০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাষ্টার্স শেষ করি।

আমাদের রাজশাহী ডট কম :- আপনার কর্মজীবন সম্পর্কে বলুন।
পড়াশোনা শেষে ইচ্ছে ছিলো নিজে কিছু করার। রাজশাহীর ঐতিহ্য রেশমকে ঘিরে কিছু স্বপ্ন ছিলো। ব্যাংকের অসহযোগিতার কারনে তা হয়ে ওঠেনি। বাধ্য হয়ে চাকরীর সন্ধানে ঢাকায় যেতে হয় ১৯৯১ সালের শুরুর দিকে। সেই বছরেই ২৮শে ডিসেম্বর ইগলু আইসক্রীমে(আব্দুল মোনেম লি:) "সেলস অফিসার" হিসেবে যোগদান করি। ১৯৯৫ সালে টিউলিপে, এবং পরে মিতসুমারুতে "মার্কেটিং ম্যানেজার" হিসেবে যোগ দান করি। পরবর্তিতে ১৯৯৬-১৯৯৮ পর্যন্ত আব্দুল মোনেম লি: এর "এমো মিল্ক" এর ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত ছিলাম।

১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি আব্দুল মোনেম লি: এর রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান হিসেবে রাজশাহীতে আসি। সে বছরেই রাজশাহীতে একটি আইসক্রীম কোল্ডস্টোর, ২০০১ সালে রংপুরে, ২০০২ সালে বগুড়াতেও আইসক্রীম কোল্ডস্টোর প্রতিষ্ঠা করি। ২০০১ সালে চাপাই নবাবগঞ্জ বিসিক এরিয়াতে "ম্যাঙ্গো পাল্প ফ্যাক্টরী" প্রতিষ্ঠা করা হয়।

২০০৯ সালের ১লা জানুয়ারী থেকে ঢাকা আইসক্রীম লি: এর ডিষ্ট্রিবিউশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছি।

আমাদের রাজশাহী ডট কম :- তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার আপনাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাজকে কিভাবে সহযোগিতা করছে?
এম এ সবুর:- বর্তমান যুগ তথ্য ও প্রযুক্তিরই যুগ। আমাদের ব্যবহারিক জীবনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের প্রতিটি শাখাতেই তথ্য ও প্রযুক্তির অবাধ বিচরন। মার্কেটিং, বিক্রয়, বিপনন সহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদেরকে তথ্য ও প্রযুক্তির সাহয্য নিতে হচ্ছে। সারাদেশের প্রতিটি শাখার সাথে প্রতিদিনের কার্যক্রম, লেন-দেনের হিসেব সব কিছুই তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারেই করা হচ্ছে।

আমাদের রাজশাহী ডট কম :- তথ্য ও প্রয়ুক্তি ব্যবহারে আপনারা কি কোনো সমস্যার সম্মুখিন হয়ে থাকেন?
এম এ সবুর:- তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারে কিছুটা সমস্যার মধ্যে পড়তেই হয়, বিশেষ করে রিমোট এরিয়াতে ইন্টারনেটের স্বল্প গতি বা ব্যবহারের অনভ্যস্থতা কিছুটা সমস্যা করে। আমরা সে সমস্যা গুলোও কাটিয়ে উঠছি।


আমাদের রাজশাহী ডট কম :- তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার রাজশাহীর অর্থনীতিতে কিভাবে ভুমিকা রাখতে পারে?
এম এ সবুর:- আমার এই স্বল্প জীবনের অভিজ্ঞতা বলে রাজশাহীতে ভারী শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এখানে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং মেধা নির্ভর যে কোনো কাজের জন্য আদর্শ জায়গা হচ্ছে রাজশাহী। সেই দৃষ্টিকোন থেকে তথ্য-প্রযুক্তির সম্ভবনা খুবই উজ্জল। রাজশাহীর রেশম পৃথিবীখ্যাত। অনলাইনের মাধ্যমে রেশম পন্যের পরিচিতি বা বিক্রয় করা যেতে পারে। যা ইতিমধ্যেই সপুরা সিল্ক এবং উষা সিল্ক করে আসছে।

রাজশাহীতে জীবন নির্বাহ ব্যয় কম এবং এখানে কম খরচে জনশক্তি পাওয়া যায়। প্রতি বছর দুইশতাধিক মেধাবি তরুন কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ডিগ্রী অর্জন করছে। এদেরকে রাজশাহীতেই কাজের সুযোগ করে দিলে দেশ লাভবান হবে।

বাংলাদেশের যেসকল প্রতিষ্ঠান তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে বিশেষ করে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের সাথে যারা জড়িত তারা তাদের একটি শাখা রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এরফলে কম খরচে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি রাজশাহীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে।

আমাদের রাজশাহী ডট কম :- রাজশাহীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আইটি প্রতিষ্ঠান থাকা সত্বেও ঢাকা থেকে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই, এ সম্পর্কে আপনার অভিমত বলুন।
এম এ সবুর:- কিছু সময় পুর্বেও রাজশাহীতে তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার এতোটা ছিলো না। বর্তমানে ইন্টারনেট অনেক সহজলভ্য হয়েছে, বেড়েছে তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার। কাজের প্রয়োজনেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডাটাবেজ সফটওয়্যার বা ওয়েবপেজ ডিজাইন করিয়ে নিচ্ছেন। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় রাজশাহীর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই উচিত অন্তত রাজশাহীর আইটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া। এরফলে স্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা বাড়াতে পারবে এবং অপরদিকে যারা কাজ করিয়ে নিচ্ছেন তারাও পরবর্তি সাপোর্টের জন্য সহজেই স্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে হাতের কাছে পাবেন। সবচেয়ে বড় কথা তাদেরকে কাজের সুযোগ দিতে হবে।

আমাদের রাজশাহী ডট কম :- রাজশাহীর আইটির ভবিষ্যত কেমন?
এম এ সবুর:- রাজশাহী বাংলাদেশের শিক্ষানগরী এবং এখানকার ছেলে-মেয়েরাও যথেষ্ঠ মেধাবী। কাজেই রাজশাহীর আইটির ভবিষ্যতের কথা এক কথায় বলতে গেলে "ঊজ্জল"। তবে সেক্ষেত্রে সরকারের সহযোগীতার আশায় বসে না থেকে নিজেদের উদ্যোগেই কাজ শুরু করে দিতে হবে।

আমাদের রাজশাহী ডট কম :- আমাদেরকে সময় দেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
এম এ সবুর:- আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।


2010-03-28


এই পাতাটি ১৯০৩ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


 মন্তব্য করতে লগিন করুন


  
.