logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo রাজশাহী নগরে চার হাজার পুকুর ভরাট
রাজশাহীকে একসময় বলা হতো পুকুরের শহর। ৫০ বছর আগে এখানে পুকুর ছিল চার হাজার ২৩৮টি। ভরাট হতে হতে এই নগরে এখন পুকুরের সংখ্যা কমে হয়েছে ৩০০।
হেরিটেজ রাজশাহী নামের একটি প্রতিষ্ঠান রাজশাহী নগরের পুকুর নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা করছে। এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী জানান, ষাটের দশকে রাজশাহী শহরে ছোট-বড় চার হাজার ২৩৮টি পুকুর ছিল। ১৯৮১ সালের জরিপে এই শহরে পুকুর পাওয়া যায় দুই হাজার ৭১টি এবং ২০০০ সালে পুকুরের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭২৯টিতে। ২০০৮ সালে সিটি করপোরেশন পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, রাজশাহী নগরে পুকুর আছে মাত্র ৩১৩টি। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ মাত্র ১৬৫টি পুকুর সংরক্ষিত তালিকায় রেখেছে।
খনন শুরু অষ্টাদশ শতাব্দীতে: হেরিটেজ রাজশাহী সূত্রে জানা গেছে, অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মারাঠা দস্যুদের (বর্গী) হামলার আশঙ্কায় মুর্শিদাবাদ ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার হাজার হাজার মানুষ রাজশাহী শহরে এসে বসবাস শুরু করে। সেই সময় মিঠাপানির উৎসের প্রয়োজনে রাজশাহীতে বহু দিঘি ও পুকুর খনন করা হয়। ১৮২৫ সালে নাটোর থেকে জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র রামপুর বোয়ালিয়াতে (বর্তমান রাজশাহী) স্থানান্তরিত হলে রাজশাহী অঞ্চলের রাজা ও জমিদারেরা শহরে বসবাসের জন্য নিজেদের বসতবাড়ি, কাচারিবাড়ি ও মন্দির নির্মাণ শুরু করেন। এ সময় তাঁরা নিজেদের ও এলাকাবাসীর প্রয়োজনে বহু পুকুর ও দিঘি খনন করতে থাকেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল মেহেরচণ্ডী দিঘি, সপুরার দিঘি, হাতিডোবা, মঠপুকুর, ছয়ঘটি, রানীপুকুর, চৌধুরী পুকুর ইত্যাদি। অবশ্য এর আগেই নীলকর সাহেবরা শহরে বেশ কিছু পুকুর ও দিঘি খনন করেন। এর মধ্যে বড়কুঠি পুকুর, কাজলা দিঘি ও শিরোইল রেশম কুঠির দিঘি উল্লেখযোগ্য।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর রাজশাহী হলো বিভাগীয় শহর। সে সময় অনেক স্থাপনা গড়ে তোলার জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে ইটভাটা তৈরি করা হয়। এই ইট বানানোর জন্য খোঁড়া জায়গা পরে পুকুরে পরিণত করা হয়। এভাবে খনন হয় শত শত পুকুর। তবে রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্রে সোনাদিঘি খনন করা হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। একসময় সোনাদিঘির পানি রান্নায় ব্যবহার করা হতো। তখন এই দিঘিতে কাউকে নামতে দিতেন না পৌরসভার পাহারাদারেরা।
ব্যাপক হারে পুকুর ভরাট: ১৯২৯ সালে মহাকাল দিঘি ভরাট করে রাজশাহী কলেজের মাঠ তৈরি করা হয়। গত ২০ বছরে ব্যাপকহারে পুকুর ভরাট করা হয়। বর্তমান রাজশাহী বাস টার্মিনালের জায়গায় ছিল প্রায় দুই একর আয়তনের একটি বিশাল পুকুর। হাতিডোবা নামের গভীর এই পুকুরটির মালিক ছিলেন জমিদার ভবানীচরণ। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শিরোইল বাস টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পুকুরটি ভরাট করে। বড়কুঠি পুকুরটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির খনন করা। পরে মেদিনীপুরের জমিদার এর মালিক হন। নগরের রাস্তা সরলীকরণের জন্য ১৯৮২ সালে এই পুকুরটি ভরাট করা হয়।
নগরের সাফাওয়াং চায়নিজ রেস্তোরাঁর পাশের তিন বিঘা আয়তনের পুকুরটি গ্রেটার রোড নির্মাণের সময় ভরাট করা হয়েছে। এই সড়কের জন্য মসজিদ পুকুরটিও ভরাট করা হয়। একইভাবে ভরাট করা হয়েছে সোবহান মিয়ার পুকুর, বন পুকুর, ধোপা পুকুর বা মুক্তা পুকুর, ইউসুফ মিয়ার পুকুর, কালী পুকুর, কল পুকুর, লাল মাঠ্যাল, ছান্দার পুকুর, মহল পুকুর, মালিবাসা পুকুর, তাঁতীপুকুর।
প্রবীণেরা যা বলেন: নগরের কাজীহাটা মহল্লার অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আজিজুর রহমান বলেন, শহরজুড়ে অনেক পুকুর ছিল। তার মধ্যে নগরের ল্যাবরেটরি স্কুলের পশ্চিম পাশের একটি পুকুরে ছোটবেলায় তিনি অনেকদিন গোসল করেছেন। এখন সেখানে বাড়িঘর উঠেছে। ওই এলাকায় গেলেই পুকুরটির স্মৃতি তাঁর মানসপটে ভেসে ওঠে। তিনি আরও বলেন, বড় কুঠি পুকুর, চৌধুরী পুকুর, গ্রেটার রোড পুকুর, ছান্দার পুকুর ইত্যাদির কথা ভাবলেই মন উদাস হয়ে যায়। জলাশয় ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় নগর এখন বেশি উত্তপ্ত।
নগরের দরগাপাড়ার মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুর রহমান বলেন, তাঁর মা রাজশাহী কলেজের মাঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখিয়েছিলেন, কলেজের ফুলার ভবনের পাশ থেকে কত দূর বিস্তৃত ছিল মহাকাল দিঘি। তাঁরাও বড় হয়ে অনেক দিঘি ও পুকুর দেখেছেন। সেসব এখন শুধুই স্মৃতি।
ভরাটের নিয়ম নেই: বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল বলেন, নিয়ম অনুযায়ী পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন এলাকার কোনো জলাধারের আকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। আর সংরক্ষিত কোনো জলাধার ভরাটের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার স্থানীয় কোনো কর্তৃপক্ষের নেই।
পুকুর কেন প্রয়োজন: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনেই চারপাশে জলাশয় থাকা দরকার। আবহাওয়া ঠান্ডা রাখা, মাছ চাষের মাধ্যমে আমিষের অভাব পূরণ ও নগরের সৌন্দর্য বাড়াতে পুকুরের প্রয়োজন। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি ধারণ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে পুকুরগুলো কাজে দিত। এখন কৃত্রিমভাবে বৃষ্টির পানি ধারণ করার কথা ভাবা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, পুকুরগুলো ভরাট করে ফেলায় এখন কোথাও আগুন লাগলে পানির অভাবে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। তিনি জানান, সম্প্রতি রাজশাহীর বিসিক এলাকা ও ছোট বনগ্রাম এলাকায় কয়েকটি সংরক্ষিত পুকুর অনুমতি ছাড়াই ভরাট করা হয়েছে। প্রায়ই নগরের কোনো না কোনো এলাকায় পুকুর ভরাটের দৃশ্য চোখে পড়ে।
আরডিএর প্রচারপত্র: রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) বেশ কিছু দিন ধরে একটি প্রচারপত্র বিলি করেছে। প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, ‘লক্ষ করা যাচ্ছে যে, আরডিএর পূর্বানুমতি ছাড়াই কোনো কোনো মালিক তাদের পুকুর ও নিম্ন ভূমি ভরাট করছেন। এ ধরনের বেআইনি কাজ দেখামাত্র আরডিএকে টেলিফোনে বা যেকোনোভাবে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হলো।’ এতে আরও বলা হয়, আরডিএ এবং এর আওতাধীন এলাকার নিম্ন ভূমি, জলাভূমি ও পুকুর ভরাটের আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
আরডিএর বক্তব্য: রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহিম বলেন, তিনি নতুন এসেছেন। তবে এটুকু বলতে পারেন, আরডিএর মাস্টারপ্ল্যানের অন্তর্ভুক্ত যেকোনো ভূমির আকার পরিবর্তন করতে হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। এখন মাস্টারপ্ল্যানের ভেতরের পুকুর কেউ ভরাট করলে তা তাঁদের জানা নেই। তাঁরা জানতে পারলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেকটি নাগরিকেরই আইন মানার দায়িত্ব আছে। সবাই আইন অমান্য করতে চাইলে এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা মোকাবিলা করা কঠিন।

সুত্র: প্রথম আলো

পাতাটি ২৯৯ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন