logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo কলেজছাত্রী গৃহিণীরাও পেলেন ভর্তুকির টাকা, বঞ্চিত কৃষক
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শিবজাইট গ্রামের কৃষক আবদুর রাজ্জাক স্বপন। চলতি মৌসুমে গভীর নলকূপের অধীনে প্রায় এক বিঘা জমিতে তিনি বোরো চাষ করেছেন। তাঁর আরেকটি পরিচয় তিনি উপজেলার গোয়ালকান্দি ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি। অভিযোগ উঠেছে, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে চাষাবাদ না করেও তুলেছেন ভর্তুকির টাকা। এ কৌশলে তিনি ব্যাংক থেকে বাবা, মা, ভাই, বোন ও ভাইদের স্ত্রীসহ ১২ জনের নামে ভর্তুকির টাকা ৮০০ করে ৯ হাজার ৬০০ টাকা তুলেও নিয়েছেন।
জানা গেছে, কৃষি কর্মকর্তাদের উৎকোচ দিয়ে চাষি না হয়েও এভাবে রাজশাহী জেলার কয়েক হাজার ব্যক্তি সরকারের
বোরো চাষিদের জন্য ডিজেল ভর্ভুকির প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার অধিকাংশই ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে। এদের তালিকায় রয়েছে চা বা পান দোকানি থেকে শুরু করে কালেজছাত্রীর নাম পর্যন্ত। ফলে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারকারী প্রকৃত চাষিরা এই ভর্তুকি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ ঘটনায় রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়নের দেউলা ব্লকের ভর্তুকিবঞ্চিত তিন শতাধিক বোরো চাষি গত বৃহস্পতিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
এ অভিযোগ স্বীকার করেছেন বাগমারা উপজেলার উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও বাগমারা উপজেলার চেয়ারম্যান ডি এম জিয়াউর রহমানও। তাঁর নিজের অভিযোগ, উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের ৪৮টি কৃষি ব্লকের সবকটিতে ডিজেল ভর্তুকির ৯৫ শতাংশ তালিকাভুক্ত লোকজনই প্রকৃত কৃষক নয়।
এ ব্যাপারে ভর্তুকির তালিকা তদারককারী রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মহসিন সাংবাদিকদের বলেছেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তালিকা তৈরিতে কিছু অনিয়মের অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। অভিযোগগুলো তদন্ত করা হবে। অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু বাগমারা নয়, জেলার ৯টি উপজেলা থেকেই এমন অভিযোগ অধিপ্তরের এ কার্যালয়ে এসেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, বাগমারার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের ৩ নম্বর কৃষি ব্লকের আওতাধীন মির্জাপুর তালতলী মোড়ের চা বিক্রেতা সিরাজ ১২ মাস চা বিক্রি করেন। জমিজমা নেই, বর্গাও করেন না। অথচ তিনি ভর্তুকি পেয়েছেন। একই গ্রামের দিনমজুর লুৎফর রহমান ও তাঁর ছেলে শফিকুল ইসলাম এক সপ্তাহ আগে ব্যাংক থেকে ডিজেল ভর্তুকির ৮০০ করে মোট এক হাজার ৬০০ টাকা তুলে এনেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লুৎফর বা শফিকুল কৃষি কাজই করেন না। কিন্তু একই গ্রামের কৃষক আকবর আলী ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে প্রায় দুই একর জমিতে বোরো চাষ করলেও তাঁর নাম এ ভর্তুকির তালিকায় ওঠেনি। একইভাবে বাগমারার সাজুরিয়া গ্রামের কৃষক শাহরিয়ার আলম তিন বিঘা বোরো আবাদ করলেও তাঁর নাম বাদ পড়েছে ভর্তুকির তালিকা থেকে।
অথচ ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি হওয়ায় পাশের শিবজাইট গ্রামের আবদুর রাজ্জাক স্বপন ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার না করেও ভর্তুকির তালিকায় নিজের নাম ছাড়াও স্ত্রী আসমা, বাবা আনসার আলী, মা রাজিয়া খাতুন, বড় ভাই আফজাল হোসেন, আফজালের স্ত্রী গয়না বিবি, স্বপনের আরেক ভাই পরেশ, পরেশের স্ত্রী মিনু বিবি, স্বপনের আরেক ভাই আনোয়ার, আনোয়ারের স্ত্রী আনজুয়ারা, স্বপনের ছোট ভাই আকবর এবং বিবাহিত বোন পলির নাম ভর্তুকির তালিকায় উঠিয়েছেন। ছোট ও বড় কৃষক হিসেবে তাঁরা নির্ধারিত ভর্তুকির টাকা হামিরকুৎসা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে সম্প্রতি উত্তোলন করেছেন। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানেও তালিকায় তাঁদের নাম দেখা গেছে।
এ ছাড়া উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের আনিছার আলী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের নামেও ডিজেলের ভর্তুকির টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। আনিছারের মেয়ে সুবর্ণা তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজের স্নাতক শ্রেণীর ছাত্রী। চাষি হিসেবে তাঁকেও ডিজেল ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের ৩ নম্বর কনোপাড়া কৃষি ব্লকে ডিজেলের ভর্তুকির জন্য ৭৪০ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এলাকার বঞ্চিত কৃষক হাসান আলী, সবুর হোসেনসহ অন্যদের মতে এই তালিকায় সর্বোচ্চ ৩৫ জন প্রকৃত চাষি রয়েছেন।
জানা গেছে, বাগমারা কৃষি অফিসের ব্লক সুপারভাইজার ইসমাইল হোসেন মাথাপিছু ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে উৎকোচ নিয়েছেন বলে অনেক কৃষকই অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্লক সুপারভাইজার ইসমাইল হোসেন উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, নেতারা যেভাবে বলেছেন, তিনি সেভাবেই তালিকা করেছেন।
অভিযোগের ব্যাপারে আবদুর রাজ্জাক স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর ভাইয়েরা বর্গাচাষি হিসেবেই ভর্তুকির টাকা নিয়েছেন। পরিবারের কোনো নারী সদস্যের নাম তালিকায় নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

পাতাটি ২৯৩ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন