logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo রাজশাহীর বাতাসে আগুনের হলকা
গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ৩০ সালা চুক্তি অনুযায়ী পানি দিচ্ছে না ভারত। ফলে এককালের প্রমত্তা পদ্মায় এখন পানি নেই। ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পাচ্ছে। চুক্তির পর গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার এই সময়ে পানির উচ্চতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। নদীর বুকে জেগে উঠেছে বিশাল ধু ধু বালুচর। নদীর মূলধারা বিভক্ত হয়ে পড়েছে অসংখ্য সরু ও ক্ষীণ ধারায়। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ চর ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার মাঠ এবং ফসলি জমি হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জনজীবন, কৃষিক্ষেত্র ও পরিবেশের ওপর। উত্তরাঞ্চলের অন্য ছোট ও মাঝারি ধরনের নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা এখন অনেকটাই মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে গত ৩-৪ দিন থেকে তপ্ত বালুবাহী বাতাসে পরিবেশ বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের বাতাসে যেন আগুনের হল্কা ছুটছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চুক্তি কার্যকর করার পর প্রতি বছরের মতো চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় পদ্মাসহ অন্যান্য শাখা-প্রশাখা নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। অনেক নদী মরে গেছে। বিলুপ্তির পথে আরও ৫০টিরও বেশি নদী।
বাংলাদেশ পানি কম পেয়ে প্রতিবছরই লিখিত-অলিখিতভাবে প্রতিবাদ করে এলেও এ ব্যাপারে ভারতের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকেও বিষয়টি বারবার উত্থাপন হলেও গত ১৩ বছরেও কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। শুধু আশ্বাসের বাণীই শোনানো হয়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) স্থানীয় অফিস সূত্রে জানা যায়, ১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী (বোয়ালিয়া-রামপুর) পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৬ দশমিক ২৮ মিটার, ১৫ সেপ্টেম্বর ১৫.৮৯ মিটার। ৩০ সেপ্টেম্বর দাঁড়ায় ১৪.৩৫ মিটার। এরপর ১৫ অক্টোবর পানির উচ্চতা দাঁড়ায় ১৫.৪৩ মিটারে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে তা দ্রুত কমে ৩১ অক্টোবর ১২.৯৩ মিটারে এসে দাঁড়ায়। গত ১ নভেম্বর পানির উচ্চতা ছিল ১২.৯০ মিটার, ৩০ নভেম্বর ১০.৮৯ মিটার, ১ ডিসেম্বর ১০.৮৫ মিটার, ৩১ ডিসেম্বর ৯.৯৬ মিটার, ১৫ জানুয়ারি ৯.৯১ মিটার, ৩১ জানুয়ারি ৯.৪৩ মিটার, ১ ফেব্রুয়ারি ৯.৪৫ মিটার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ছিল ৯.০৩ মিটার। ১ মার্চ ছিল ৯.০০ মিটার। গত ২২ মার্চ কিছুটা বেড়ে ছিল ৯.২২ মিটার। ১ এপ্রিল ছিল ৮.৫৪ মিটার, ১৫ এপ্রিল ৮.৫৬ মিটার, ৩০ এপ্রিল ৯.১৪ মিটার, ১ মে ৯.১৯ মিটার এবং ১২ মে ছিল ৮.৫৮ মিটার; যা চুক্তি কার্যকরের পর সবচেয়ে কম। ভারত যে হারে প্রতিবছর পানি কম দিচ্ছে এতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রাজশাহী অঞ্চল ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হবে। আর পদ্মার পানি যেভাবে কমছে তাতে চলতি মাসের শেষ নাগাদ ৮ মিটারের নিচে নেমে যাবে বলে অভিজ্ঞজনের অভিমত।
অন্যদিকে এর আগের মৌসুমে ২০০৮ সালে ১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী (বোয়ালিয়া-রামপুর) পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭.৯৫ মিটার। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে তা দ্রুত কমে ২৪ সেপ্টেম্বর দাঁড়ায় ১৪.৬৮ মিটারে। এরপর ৩১ অক্টোবর আরও কমে ১২.৬৭ মিটারে এসে দাঁড়ায়। ১ নভেম্বর পানির উচ্চ আরও কমে ১২.৬৩ মিটার এবং ৩০ নভেম্বর ১২.৩২ মিটার। একইভাবে ১ ডিসেম্বর ১১.২৬ মিটার এবং ৩১ ডিসেম্বর ১০.১৫ মিটার। ২০০৯ সালের ৩১ জানুয়ারি ৯.৫৬ মিটার, ১ মার্চ ৮.৯০ মিটার, ৩১ মার্চ ছিল ৮.৩৯ মিটার এবং ১২ মে ছিল ৮.৭৫ মিটার।
সংশ্লিষ্ট দফতরের তথ্যমতে, ভারতের সঙ্গে পানিচুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে ১৯৯৫ সালে শুষ্ক মৌসুমে অর্থাত্ ১২ মে পদ্মায় পানির প্রবাহ ছিল ৯.৪৬ মিটার এবং ১৯৯৬ সালে ১০.১৯ মিটার। চুক্তি কার্যকরের পর ১৯৯৭ সালে কিছুটা বেড়ে ১০.২৫ মিটার। ১৯৯৮ সালে ১১.৪১ এবং ১৯৯৯ সালে ১০.৪৫ মিটার হয়। এরপর থেকে আবার কমতে থাকে। ২০০০ সালে ১২ মে ১০.৪২ মিটার, ২০০১ সালে ১০.৩০ মিটার, ২০০২ সালে ১০.৩৪ মিটার, ২০০৩ সালে ৯.৬৭ মিটার, ২০০৪ সালে ৯.২৭ মিটার, ২০০৫ সালে ৯.১১ মিটার, ২০০৬ সালে ৮.১২ মিটার এবং ২০০৭ সালে ৯.০৫ মিটার, ২০০৮ সালে ৮.০৮ মিটার, ২০০৯ সালে ৮.৭৫ মিটার এবং ২০১০ সালের ১২ মে ৮.৫৮ মিটার পানি প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। এতে প্রমাণিত হয়, ভারত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না। বরং পানিবণ্টনের নামে বাংলাদেশের পর্যবেক্ষক প্রতিনিধি দলকে প্রতারিত করছে। ভারতের আচরণ বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী জুনে বর্ষা শুরু হওয়া পর্যন্ত পানিপ্রবাহের এ ধারা অব্যাহত থাকবে। এতে বাংলাদেশ বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এতে কৃষিক্ষেত্র, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যসহ সর্বত্র নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সূত্র জানায়, ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর তুলনামূলক এই সময়ে এ বছর পদ্মা নদীতে (বোয়ালিয়া-রামপুর) পয়েন্টে পানির প্রবাহ সবচেয়ে কম। গঙ্গা নদীর উজানে, বিশেষ করে ফারাক্কা বাঁধ পয়েন্টে আগেভাগেই ভারতের অতিরিক্ত হারে পানি প্রত্যাহার এবং ১ জানুয়ারি থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা না দেয়ার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় পাউবো বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এদিকে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এর বিরূপ প্রভাবে নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে এসব এলাকায় হাজার হাজার হস্তচালিত নলকূপে পানি উঠছে না। অগভীর নলকূপ অচল হয়ে গেছে। সর্বত্রই পানির জন্য হাহাকার।
উল্লেখ্য, গঙ্গা নদী থেকে কমপক্ষে ৪০ হাজার কিউসেক (প্রতি সেকেন্ডে এক ঘনফুট) পানি ভাগিরথী-হুগলি নদীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারত গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে। ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার পর বাংলাদেশকে তার ন্যায্য হিস্যা না দিয়ে ভারত গঙ্গা নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিতে থাকে। এর ফলে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। কয়েকটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার পর ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ভারত ও বাংলাদেশ অবশেষে স্বাক্ষর করে ৩০ সালা পানিবণ্টন চুক্তি। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ১৫০ দিন গঙ্গার পানিবণ্টন করা হয়। চরম শুষ্ক সময়ে (১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত) উভয় দেশের ১০ দিন পরপর কমপক্ষে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত এই চুক্তি পুরোপুরি অনুসরণ করে না। প্রতিবছরই বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

পাতাটি ২৬১ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন