logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo আন্দোলনের ঘোষণায় নেতাকর্মীরা চাঙ্গা
রাজশাহীর জনসমুদ্রে খালেদা জিয়া আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়ার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়ার পর বিএনপি রাজপথের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। খালেদা জিয়ার ঘোষণায় নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত। চারদলীয় জোটের শরিক দল ছাড়াও সরকারবিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন এবং বিশিষ্টজনরাও দেশের বর্তমান অসহনীয় পরিস্থিতিতে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বয়স হয়েছে ১৬ মাস। এই কয়দিনে সরকারের কোনো সফলতা নেই বলে দাবি করেছে বিরোধী দল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে প্রতিদিন। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২টি খুন হচ্ছে। খুন থেকে রেহাই পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যরাও। বাড়ছে গুপ্ত হত্যা। এতে সাধারণ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে। পুলিশের উচ্চ পর্যায়েও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চলছে সাংবাদিক হত্যা। সাংবাদিক দলনসহ গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে জনপ্রিয় চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। চলছে ছাত্রলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাস। তাদের টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিতে জনজীবন অতিষ্ঠ। সম্প্রতি বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগ দুই গ্রুপের মধ্যের মারামারির যে ছবি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ কোথায় সে প্রশ্ন জরুরিভাবে এসে যায়। একই সঙ্গে সরকার পানি-বিদ্যুত্-গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। প্রশাসন ও বিচার বিভাগে চলছে উলঙ্গ দলীয়করণ।
এ অবস্থায় রাজপথের আন্দোলনে নামছে বিএনপি। আগামী ১৯ মে ঢাকায় দলের যে মহাসমাবেশ হবে তাতে হরতালসহ কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হবে। কী ধরনের কর্মসূচি আসতে পারে—এ ব্যাপারে বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বলেন, জনগণ হরতালের মতো কর্মসূচি চায়। এরই মধ্যে বগুড়ায় স্থানীয়ভাবে অর্ধদিবস হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আসলে আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে চাই। তা করেও আসছি। কিন্তু সরকার আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিগুলোতে বাধা দিচ্ছে। রাজশাহীর মহাসমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার পথে নাটোরের সিংড়ায় বিএনপি চেয়ারপার্সনের গাড়িবহরে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে। আমরা যতই শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে চাই, সরকার ততই এই কর্মসূচিকে ভিন্ন দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করছে। সে জন্য আমাদের চেয়ারপার্সন দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটি যুগোপযোগী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন আগামী ১৯ মে।
বিএনপি এরই মধ্যে বগুড়ায় হরতালসহ চারদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। রাজশাহী মহাসমাবেশে যাওয়ার পথে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে আওয়ামী লীগের হামলার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি দেয়া হয়। এ হামলায় বগুড়ার বিএনপি নেতা জাকির হোসেন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট যে সরকার গঠন করে, তাকে সহযোগিতা করার নীতি নেয় বিএনপি। এ জন্য দলটি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। তারা নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনই সংসদে যোগ দেয়। এর আগের দু-তিনটি সংসদে এমন নজির দেখা যায়নি। এমনকি সংসদের ডেপুটি স্পিকারের একটি পদ বাড়িয়ে তা বিরোধী দলকে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হলে তাও নেবে বলে সায় দেয় বিএনপি। সরকারের ১৬ মাসে আন্দোলনের বড় কোনো কর্মসূচি দেয়া হয়নি। সরকারের এক বছরপূর্তির প্রাক্কালে সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় খালেদা জিয়া বলেছেন, একটি অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে যেভাবেই হোক নির্বাচিত সরকার শ্রেয়। এ জন্যই আমরা মহাজোট সরকারকে সহযোগিতা করার নীতি ঘোষণা করেছিলাম। আমরা চাই, সরকার নির্বাচনের সময় যে ওয়াদা করেছিল, তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করুক। এ জন্য আমরা সরকারের এক বছরে হরতালসহ আন্দোলনের বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি দেইনি।
বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, আমরা সরকারকে সহযোগিতা করার কথা বলেছিলাম। কিন্তু তার বদলে সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করার নীতি নেয়। সরকারি দলের নেতাদের হত্যা-ধর্ষণের মামলা রাজনৈতিক দেখিয়ে প্রত্যাহার করা হলেও আমাদের নেতাকর্মীদের একটি মামলাও প্রত্যাহার করা হয়নি। উল্টো ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে জিয়া পরিবারকে বিতাড়নের নোটিশ দেয়া হয়েছে, জিয়া ও খালেদা জিয়ার নামের সব স্থাপনার নাম বদল করাসহ জিয়া পরিবার এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে নতুন নতুন মামলা দেয়া হচ্ছে।
তাই বিএনপি এতদিন জনস্বার্থ জড়িত ইস্যুগুলো নিয়ে ‘সহনশীল কর্মসূচি’ দিলেও এখন বড় ধরনের কর্মসূচি দেয়া হবে বলে নেতারা বলছেন। রাজশাহীতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া নিজেই বলেছেন, সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে হরতালসহ আন্দোলনের কর্মসূচি ঢাকার মহাসমাবেশে ঘোষণা করা হবে।
কী ধরনের কর্মসূচি আসতে পারে জানতে চাইলে বিএনপি সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, এ পর্যন্ত আমরা যে আন্দোলন করেছি, তা সহনশীল বলা যায়। আইনশৃঙ্খলা মেনেই আন্দোলন করেছি। মিছিল-মিটিং করতে বাধা দেয়া হলেও আমরা পাল্টা কিছু করিনি। যেখানে বাধা দেয়া হয়েছে, সেখানেই থেমে গেছি। কিন্তু এখন জনগণ আরও শক্ত কর্মসূচি চায়। রাজশাহীর সমাবেশে জনগণ সেম্লাগান দিয়ে আরও শক্ত কর্মসূচি দেয়ার দাবি জানিয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের চেয়ারপার্সন যে ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, তাও আন্দোলনের একটি অংশ। তিনি জনগণের উদ্দেশে বলেছেন, হরতালের জন্য প্রস্তুত আছেন কিনা। তিনি সবাইকে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হতেও বলেছেন। সুতরাং আগামীতে যে আন্দোলনের কর্মসূচি আসবে, তাতে হরতাল থাকছে। হরতাল কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনেরই অংশ। এর সঙ্গে মিছিল-মিটিং, ঘেরাও ও পদযাত্রা তো থাকবেই। এছাড়া পানি-বিদ্যুত্-গ্যাস ও দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবিতে জেলা-উপজেলায় আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে।
বিএনপি যে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করবে, সে ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বলেন, বিরোধী দলের ওপর সরকারের নির্যাতনের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, এখন দাবি করে বা অনুনয়-বিনয় করে লাভ নেই। ছাত্রলীগকে দিয়ে বিরোধী দলের মিছিল-মিটিং পণ্ড করে দেয়া হচ্ছে। তাদের সহযোগিতা করছে প্রশাসন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোথাও মিছিল-মিটিং করতে গেলে প্রশাসনকে আমরা জানাই। কিন্তু দেখি আমাদের যাওয়ার বিষয়টি ছাত্রলীগ জেনে গেছে। আবার প্রশাসনকে আগে না জানালে ছাত্রলীগও আমাদের যাওয়ার বিষয়টি আগে জানতে পারছে না। এ থেকে বোঝা যায়, প্রশাসন আমাদের যাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশাসন তো আর নিজের গরজে এ কাজ করছে না। সরকার চায় বলেই প্রশাসন তা করছে। তাই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এটা আমাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিও। কিন্তু আমরা আন্দোলন সব সময় সাংবিধানিক ও আইনি পথেই করতে চাই।
খেলাফত মজলিস আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া আগামী ২১ মে ঢাকায় যে বৃহত্ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন, তাকে স্বাগত জানাই। কারণ বর্তমান সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন, জুলুম এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে তাকে রুখতে হলে আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, বিভিন্ন ইস্যুতে মানুষের ক্ষোভ আছে, কষ্ট আছে। কিন্তু এই ক্ষোভ-কষ্টকে সংগঠিত করতে হবে। এটা সংগঠিত করার জন্য বিএনপি সাংগঠনিকভাবে কতটুকু তত্পরতা দেখাতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করছে সফলতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইউএবি রাজিয়া আক্তার বানু বলেন, কর্মসূচি দেয়া ভালো। ছাত্রলীগ যেসব কাজ করছে, তা জনগণ ভালো চোখে দেখছে না। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ এই টানাপড়েনকে বিএনপি যদি কাজে লাগাতে পারে তাহলে ভালো হয়।

পাতাটি ২৮৫ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন