logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo মরুকরণের পথে বরেন্দ্রভূমি
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে রাজশাহীতে বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে। নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। বিপর্যয়ের মাত্রা বাড়িয়েছে বরেন্দ্র এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন। এ অঞ্চলে বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত বৃক্ষ রোপণও পরিবেশেরও ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এভাবে দিন দিন মরু এলাকার রুক্ষ পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে।
পানিপ্রবাহ গিয়ে চর পড়েছে পদ্মা নদীতে। রাজশাহী শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে সরে গিয়ে একটি ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে এটি। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ফসল ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
জানা গেছে, পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের বিকল্প পদ্ধতিতে চাষাবাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় এবার বরেন্দ্র অঞ্চলে রেশমের আষাঢ়ী ‘বন্দ (মৌসুম)’ পুরোটাই মার খেয়েছে। কোনো গুটি হয়নি। নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার যেসব এলাকায় এত দিন প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে বর্ষাকালীন মরিচের চাষ করা হতো, সেখানে অসময়ে খরা ও বৃষ্টিপাতের কারণে চার বছর ধরে আর ঠিকমতো মরিচের চাষ করা যাচ্ছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার নলতৈড়, কালীনগর, চকদেবীরাম, দৌডাঙ্গি, ছোটমুল্লুক, চকগোবিন্দ, থানতলা ও রামনগর গ্রামের প্রধান অর্থকরী ফসল হচ্ছে পেঁয়াজ ও বর্ষাকালীন মরিচ। কিন্তু তিন-চার বছর ধরে এসব গ্রামে অসময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও খরার কারণে এই দুটি ফসল ভালো হচ্ছে না। নলতৈড় গ্রামের মরিচ-চাষি তৈয়ব আলী বলেন, বর্ষাকালীন মরিচ আমাদের প্রধান অর্থকরী ফসল। গত বছর তিনি তিন বিঘা জমিতে মরিচের চাষ করেছিলেন। কিন্তু পর পর দুই বছর অতিরিক্ত বৃষ্টি ও গত বছর অতিরিক্ত খরার কারণে মরিচের গাছ বাড়তে পারেনি। কোনো ফলনও হয়নি। তিনি বলেন, লাভজনক এই অর্থকরী ফসলটি তাঁরা রাতারাতি ছাড়তেও পারছেন না। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবার বিঘা দেড়েক জমিতে মরিচের চাষ করবেন।
জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে রাজশাহীর একটি বেসরকারি সংস্থা বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রচেষ্টা। সংস্থার মাঠ সমন্বয়কারী রাশেদ রিপন বলেন, এক বছরে পলুচাষিরা গুটি উত্পাদনের চারটি বন্দ পেয়ে থাকে। এবার আষাঢ়ী বন্দের সময় বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে পলুপোকা গুটি তৈরি করেনি। এতে রাজশাহীর চারঘাট, বাঘা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের পলুচাষিরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হন। তিনি বলেন, এটা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণেই হয়েছে।
রাজশাহী বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ এলাকায় ১৯৮০ সাল থেকে মরুকরণ প্রক্রিয়া রোধ ও জ্বালানি কাঠের চাহিদা পূরণের জন্য কমিউনিটি ফরেস্ট্রি প্রকল্পের মাধ্যমে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম শুরু করা হয়। এতে জ্বালানি কাঠের চাহিদা কিছুটা মিটলেও মরুকরণ রোধে তা কোনো কাজে আসেনি এবং পরিবেশের ভারসাম্যও সামান্যই রক্ষা পেয়েছে। পক্ষান্তরে বনায়নের নামে বন বিভাগ ছাড়াও সরকারের আরও কয়েকটি সংস্থার মাধ্যমে হর্টিকালচার পদ্ধতিতে এই এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ প্রান্তিক ভূমিতে গাছ লাগানো হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে মূল শেকড় কেটে গাছ লাগানো হয়। এতে উল্টো বিপদ ডেকে আনা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজশাহী সামাজিক বন বিভাগের পবা সামাজিক বনায়ন নার্সারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো রবিউল ইসলাম বলেন, অন্যান্য সংস্থার রোপিত গাছের প্রধান মূল মাটির গভীরে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় শাখামূল বিস্তার করে গাছ বেড়ে উঠছে। অথচ যে গাছগুলো মাটির গভীরে শেকড় ছড়ায়, সেগুলো মাটির গভীরে পানির স্তর ধরে রাখে। কিন্তু হর্টিকালচার পদ্ধতিতে লাগানোর কারণে গাছগুলো খর্বাকৃতির হচ্ছে, গাছের প্রস্বেদন হার কমে যাচ্ছে। এই গাছগুলো বাতাসে জলীয় বাষ্প বিস্তারে সহায়ক হচ্ছে না। বরং গাছগুলো কৃষিকাজে ব্যবহূত মাটির উপরিভাগের রস টেনে নিচ্ছে। এতে মাটির উপরিভাগে শুষ্কতা বাড়ছে। মরুকরণ ত্বরান্বিত হচ্ছে।
৯ নভেম্বর রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের গ্রিন প্লাজায় বেসরকারি সংস্থা আশ্রয় আয়োজিত এক কর্মশালায় বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি, পানির স্বল্পতা, স্বল্পমাত্রার ক্ষারত্ব, খরা ও ভূ-উপরিস্থ জলের স্বল্পতা দেশের অন্য অঞ্চলের কৃষকদের চেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত করে তুলছে। কমে গেছে উত্পাদিত ফসলের পরিমাণ ও গুণাগুণ।

পাতাটি ৩৯২ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন