logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo রাজশাহী রেশম কারখানা খোলার খবর নেই, হচ্ছে না বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজশাহী সদর আসনের মহাজোট প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশা ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি রেশম কারখানা চালু করার ব্যবস্থা করবেন। রাজশাহীতে রেশম শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে।
একইভাবে মেয়র নির্বাচনের আগে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান ঘোষণা দিয়েছিলেন রাজশাহীর কাটাখালীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু করা হবে।
গত এক বছরে রাজশাহী রেশম কারখানা খোলার কোনোই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বরং সরকারি এ কারখানাটি বেসরকারীকরণের দিকে যাচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য টেন্ডার আহ্বান আর মন্ত্রীর পরিদর্শন করার পর চূড়ান্ত পর্বে এসেও তা বাতিল করা হয়েছে।
এসব নিয়ে সাংসদ এখনো বলছেন, হবে। আর মেয়র নিজেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জনতার সঙ্গে মাঠে নেমেছেন। ভুক্তভোগী এলাকাবাসী বলছেন, যে যা-ই করুন না কেন, রাজশাহীর মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
রাজশাহী শহরের সরকারি রেশম কারখানাটি ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট থেকে বন্ধ রয়েছে। ১৯৬১ সালে স্থাপিত এ কারখানাটির আধুনিকায়নে ২০০০ সালের ২৯ অক্টোবর কারিগরি ভবন উদ্বোধন করে নতুন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হয়। এখন পরিত্যক্ত কারখানাটিতে শুধু রেশম বোর্ডের কয়েকজন পাহারাদার রয়েছে। মূল্যবান এসব যন্ত্রপাতি পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
নির্বাচনের এক দিন আগে মহাজোটের প্রার্থী এক বক্তৃতায় বেসরকারি চ্যানেলে বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি এ কারখানাটি চালু করবেন। তাঁর এই ঘোষণায় কারখানার ছাঁটাই হওয়া ২২২ জন শ্রমিকের সঙ্গে রাজশাহীবাসী আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের মেয়াদ এক বছর পূর্ণ হলেও এ ব্যাপারে রাজশাহীবাসীর জন্য কোনো আশার বাণী নেই।
জানতে চাইলে সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা জানান, ‘হবে তবে বেসরকারীকরণ কমিশনের সঙ্গে এর টানাপোড়েন চলছে। কমিশন এ কারখানাটি বেসরকারীকরণ করতে চাইছে। আমি এটা হতে দেবো না বলে মন্ত্রীকে বলেছি, তিনি পার্লামেন্টেও তুলেছেন বিষয়টি। আর রেশম শিল্পনগরীও প্রতিষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে, রাজশাহীতে বিদ্যুতের জন্য একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র ছিল কাটাখালী বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন সরকার এ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রটি তৈরি করেন। তখন তিনটি ইউনিটে ১ দশমিক ১৮ মেগাওয়াট এবং অপর তিনটি ইউনিটে দশমিক ৫ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। জ্বালানি হিসেবে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেল তেল ব্যবহার করা হতো।
রাজশাহী পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে উৎপাদন কেন্দ্রের ইউনিটগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। ফলে শেষ সময়ে ১৯৯৯ সালে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ এতই বেশি পড়তে থাকে যে, কর্তৃপক্ষ এটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এরপর আর কেন্দ্রটি চালু করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
৩৫ একর জমির ওপরে স্থাপিত রাজশাহীর কাটাখালী বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের পাওয়ার হাউস থেকে শুরু করে সবকিছুই পড়ে আছে। এমনকি নয় বছর আগে নিয়ে আসা জ্বালানি তেল-ডিজেলও একইভাবে রয়েছে। চারদিকে জঙ্গালাকীর্ণ হয়ে শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারগুলোয় ভুতুড়ে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পাশেই রয়েছে জাতীয় গ্রিড। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, পরিত্যক্ত এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের আনুষঙ্গিক সব সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রায় ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে।
রাজশাহীর বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্রের প্রকৌশলীরা বলছেন, এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করা হলে রাজশাহীতে লো ভোল্টেজ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। রাজশাহীতে মোট ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে এখানে ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে জাতীয় গ্রিড ফেল করলেও রাজশাহীতে সমস্যা হবে না। এখানে বোরো মৌসুমে অনেক জেনারেটর লো ভোল্টেজের কারণে পুড়ে যায়। এ সমস্যা তখন আর থাকবে না।
নির্বানের আগে বর্তমান মেয়রের প্রতিশ্রুতি ছিল এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করার। নির্বাচনের পর তিনি এটি সচল করার উদ্যোগ নেন। গত ৩ এপ্রিল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চার সদস্যের একটি দল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করার বিষয়ে সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে আসেন।
এরপর গত ১৪ জুন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু এ কেন্দ্রটি পরিদর্শনে আসেন। তিনি পাওয়ার স্টেশনটি দেখেন এবং এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরায় চালু করার ব্যাপারে স্থানীয় প্রকৌশলীদের পরামর্শ চান। পুরাতন ইউনিটগুলো প্রতিস্থাপন করতে হলে কী পরিমান খরচ হতে পারে সে সম্বন্ধে স্থানীয় প্রকৌশলীরা মন্ত্রীকে ধারণা দেন।
কিন্তু সম্প্রতি দরপত্র জমা নেওয়ার পরেও রাজশাহীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। গত ৩০ ডিসেম্বর বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলের খবর রাজশাহীতে ছড়িয়ে পড়লে রাজশাহীর সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে রাজশাহী শহরের জিরোপয়েন্টে মানববন্ধন করা হয়। সমাবেশে মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামানও যোগ দেন। তিনিও দাবি আদায়ের জন্য জনগণকে সঙ্গে করে রাজপথে আন্দোলনের ঘোষণা দেন।
মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন জানান, স্বাধীনতার পর থেকেই আমলাতান্ত্রিক জটিলাতার অজুহাত দেখিয়ে রাজশাহীর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছিল বাগমারার সাংসদ এনামুল হকের প্রতিষ্ঠান। তিনি আরও জানান, রাজশাহীতে সরকারের ছয়জন সাংসদ ও নিজে মেয়র থাকার পরেও কারা এ প্রকল্পটি বাতিল করে সেটিই প্রশ্ন এবং এটি একটি রহস্য। দাবি আদায়ের জন্য তিনি প্রয়োজনে রাজশাহীর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করবেন।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জামাত খান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানান, রাজশাহীকে নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। রাজশাহীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। বর্তমান মহাজোট সরকারে রাজশাহীর সবকটি আসনের দলীয় সাংসদ ও মেয়র থাকলেও রাজশাহীর উন্নয়নকে বারবার বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, দেশে আরও ছয়টি বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন পেলেও রাজশাহীর প্রকল্পটি ফাইলবন্দী থাকায় এ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা থাকার পরেও প্রকল্পটির মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ না পাওয়া দুঃখজনক। এ নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলে তিনি ঘোষণা দেন।
তিনি আরও জানান, রাজশাহীর কাটাখালীতে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্লান্টটি মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরা কয়েক দফায় পরিদর্শন করেও প্রকল্পটির জন্য সুপারিশ করেননি। ফলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সুপারিশ না করায় প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

পাতাটি ৩০০ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন