logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ছাত্রলীগ বেপরোয়া, শিক্ষার্থীরা জিম্মি

ছাত্রলীগের রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার বর্তমান কমিটি শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিয়ে হলেও সংগঠনটির বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে জিম্মি হয়ে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।

ইনস্টিটিউটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, কেবল ছাত্রাবাসের সিট দখল, ডাইনিংয়ে অবৈধ সুবিধা আদায়, ভাঙচুর-সংঘর্ষ নয়; ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ভর্তি-বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণেই তারা বেপরোয়া। এমনকি ক্যাম্পাসে কোনো ভাঙচুর কিংবা সংঘর্ষের ঘটনায় কর্তৃপক্ষ মামলাও করতে পারে না।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার সহসভাপতি রেজওয়ানুল ইসলাম খুন হওয়ার আগে ছাত্রলীগের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ স্থানীয় আওয়ামী লীগকে জানিয়েছিল। কিন্তু সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই ওই খুনের ঘটনা ঘটে বলে দলটির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানা যায়, রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে গত বছরের অক্টোবরে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখনো ছাত্রাবাসের সিট বরাদ্দের জন্য কোনো ব্যবস্থা করতে পারেনি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, ইনস্টিটিউটের শহীদ মোনায়েম ছাত্রাবাসের ৩১০ নম্বর কক্ষের চারটি সিটই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দখলে। এভাবে গত বছর ৫৪ জন শিক্ষার্থী পাস করে ছাত্রাবাস ত্যাগ করলেও নিয়মমাফিক খালি সিটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ওই সিটগুলো ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দখলে। ৩ জানুয়ারি শাহ নেয়ামতুল্লাহ ছাত্রাবাসের ২০২ নম্বর কক্ষে ককটেল বিস্ফোরণ হয়। এ কক্ষের চারজন শিক্ষার্থীর সবাই ছাত্রলীগের কর্মী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ছাত্র জানান, একসময় তিনি একটি ছাত্রাবাসের ডাইনিংয়ের ব্যবস্থাপক ছিলেন। সে সময় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল, ছাত্রাবাসের অবৈধ শিক্ষার্থীদের ডাইনিংয়ে খেতে দেওয়া হবে না। উল্টো অবৈধ শিক্ষার্থীরা যেভাবে খেতে চান তাঁদের সেভাবে সুযোগ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ।

পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে শিক্ষার পরিবেশ নষ্টের পেছনেও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জড়িত বলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। তাঁরা বলেন, নানা অজুহাতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করেন। এবার মান উন্নয়ন পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর নেতা খুন হলেন। এতে ইনস্টিটিউট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলো।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ছাত্রদলও বেপরোয়া ছিল। মাঝে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ক্যাম্পাস শান্ত থাকলেও বর্তমানে আবার অস্থির। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা যায় না।

জানা যায়, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যেও একাধিক সংঘর্ষ হয়েছে। গত বছরের ২৩ মার্চ ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি নিজাম উদ্দিন ও হাতেম আলীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে গুরুতর আহত অবস্থায় নিজামকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগের দিনও ওই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে দুজন আহত হয়।

ওই ঘটনার পর সভাপতি নিজাম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, এটা দুই পক্ষের কোনো বিষয় নয়। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সংগঠনের দুই কর্মীর মধ্যে একটা বিবাদ হয়েছিল।
তবে ওই সময় রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জেডু সরকার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, কমিটি গঠন নিয়ে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই ওই সংঘর্ষ হয়েছিল।

বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর রাজশাহী মহানগর শাখার সভাপতি মতিউর রহমান অভিযোগ করেন, নিজাম উদ্দিন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভর্তি-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। ভর্তি-বাণিজ্যের অর্জিত টাকা দিয়েই তিনি মোটরসাইকেল কেনেন। তাঁরা ক্যাম্পাসে অনেক অঘটন ঘটান, ভাঙচুর করেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না।

রাজশাহী সদর আসনের সাংসদ ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ছাত্রমৈত্রীর নেতা খুনের ঘটনায় জড়িতরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্রয় পেয়েই আজ বেপরোয়া। তারা আগেও অনেক ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটত না।

এ ব্যাপারে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন ভর্তি-বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করে বলেন, যাদের স্বার্থে টান পড়ে, তারাই এমন কথা বলে।

তবে তিনি বলেন, ছাত্রাবাসের সুপাররা সিট দখলের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে সাহস পান না, দায়িত্বও নিতে চান না। ক্যাম্পাসে ভাঙচুরের ঘটনায় কোনো মামলা না করার কথাও অধ্যক্ষ স্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের কোনো ক্ষতি হলে তাঁরা সাধারণত থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে থাকেন।

এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের রাজশাহী মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক জেডু সরকার বলেন, ‘ব্যর্থতার জন্য আমরা ছাত্রলীগের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার সভাপতিকে বহিষ্কার করেছি। তাঁদের প্রশ্রয় দেওয়া হয় না।’

আওয়ামী লীগের রাজশাহী মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বলেন, গত বৃহস্পতিবার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সংঘর্ষের ঘটনাটি সাংগঠনিক নয়। নিজাম সন্ত্রাসীদের নিয়ে এ হামলার ঘটনা ঘটায়। সংগঠনপরিপন্থী বেপরোয়া আচরণের জন্য নিজামকে আগেই বহিষ্কারের চিন্তাভাবনা করছিল ছাত্রলীগ।

ভর্তি-বাণিজ্য থেকে অর্জিত অর্থে নিজামের মোটরসাইকেল কেনার অভিযোগ প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়টি শুনেছি। এ ব্যাপারে অধ্যক্ষেরও ব্যর্থতা রয়েছে।’ ছাত্রলীগকে রাজনৈতিক প্রশ্রয় দেওয়া বা আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

ইনস্টিটিউটে মোট শিক্ষার্থী দুই হাজার ৫০০ জন। আটটি বিভাগে দুই শিফটে ক্লাস চলে। রয়েছে দুটি ছাত্রাবাস ও একটি ছাত্রী নিবাস। এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্যরা এখানে ভর্তির পর চার বছর মেয়াদি কোর্স শেষে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হন।

পাতাটি ৩২৯ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন