logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo ব্লগার হত্যা ও ধর্মবিদ্বেষ দুটোই অপরাধ : মাসুদ মজুমদার
সরকারের বিভাজনের রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক ফলাফল অপেক্ষমাণ। ইতোমধ্যে স্বল্পমেয়াদি কুফলগুলো ফলতে শুরু করেছে। গণতন্ত্রহীনতার বাতাবরণের ভেতর চরম বাম ও চরম ডান দু’টি প্রান্তিক ধারা জন্ম নিয়েছে। আগেও এটি ছিল চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, অপশাসন ও বাকশাল গঠনের আগের প্রেক্ষাপটে। এটি অগণতান্ত্রিক সরকারের নেতিবাচক ক্রিয়ার পাল্টা প্রতিক্রিয়া। চরম বামপন্থী ভাবনায় নতুন করে যোগ হয়েছে যেকোনো ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করার প্রবণতা। এটা বোধ করি বৈশ্বিক প্রোপাগান্ডার বাংলাদেশী সংস্করণ। অন্য দিকে নিয়মতান্ত্রিক পথ হারিয়ে চরম ডান ভাবনায় জন্ম নিয়েছে অতি চৈতন্য লালনকারী একধরনের চরমপন্থী। প্রান্তিক চিন্তার দুই ধারারই শেষ কথা সরকার নিয়ম মানে না, গণতন্ত্র মানে না, বিচার মানে না, আইন মানে না, মানবাধিকার মানে না, আইনের শাসন মানে না, মৌলিক অধিকার পর্যন্ত স্বীকার করে না- তখন নকশালী কায়দায় বা সর্বহারা ধারায় শ্রেণিশত্রু খতম করে এগোতে হবে। যে সরকার আইন মানে না- তাদের আমলে আইন হাতে তুলে নেয়াই তারা নিজেদের জন্য বৈধ বানিয়ে নিয়েছে। এরা হঠকারিতারই পথ বেছে নিয়েছে। তাদের ভাষায়- এই পথ বেছে নিতে তারা বাধ্য হয়েছে। এই সরকারকে এবং তাদের কথিত আদর্শের সব প্রতিপক্ষকে প্রতিবিপ্লবী ও শ্রেণিশত্রু আখ্যায়িত করছে। একইভাবে চরম ডানপন্থী যাদের জঙ্গি বলা হচ্ছে, কথায় কথায় মৌলবাদী, তালেবান, আলকায়েদা, নাসরুল্লাহ ও আনসার উল্লাহ খেতাব দেয়া হচ্ছে- তারা নিজেদের মতো করে জেহাদের একটা সংজ্ঞা বানিয়ে নিয়েছে। আমার ধারণা ভুলও হতে পারে, তবে রবিন হুড, দস্যু বাহরাম, দস্যু বনহুর ও কিরিটি রায় ধরনের সুপারম্যান হওয়ার রোমান্টিক ধারণা একটা বয়স পর্যন্ত যেকোনো মানুষের ভেতর বসবাস করতে পারে। বিশেষত স্বপ্নভঙ্গের কারণে আশাহত তারুণ্যের ভেতর একধরনের দ্রোহের জন্ম নেয়। সেই দ্রোহ থেকে বিদ্রোহের ভ্রুণ বিকশিত হতে থাকে। তাদের কাছে খুন-জখম তখন সাধারণ বিষয় মনে হয়। তারা ধরে নেয়, ভালো লক্ষ্যে খারাপ কাজ করা যায়। যেমন সরকার গণতন্ত্রহীন এক অলিক উন্নয়নের ডুগডুগি বাজাচ্ছে। একবার চরমপন্থী সেজে গেলে, এরা নিজের মৃত্যুকেও হাতছানি দিয়ে ডাকতে ভয় পায় না। ধরেই নেয় তার মৃত্যু এক ‘মহান ত্যাগের’ জন্য। অথচ কোনো ভালো কাজ খারাপ পদ্ধতিতে হয় না। নীতিশাস্ত্রের এ সত্য উচ্চারণটি আমাদের সরকারও মানে না।
সম্প্রতি কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে রাষ্ট্রের বা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতার সংযোগ খুঁজে পাওয়ার পর চরমপন্থীরা যেন যুক্তি খুঁজে পেল- বিনা বিচারে মানুষ হত্যা কোনো অপরাধ নয়। তারা কুযুক্তি দিয়ে সম্ভবত বলতে চায়, রাষ্ট্র যদি তার সন্তানতুল্য নাগরিকদের বিনা বিচারে হত্যা করতে পারে, তাহলে ‘আদর্শিক’ ভাবনায় বিদ্রোহী কিংবা ‘খোদাদ্রোহীকে’ হত্যা করা ন্যায়সঙ্গত। আমাদের কাছে মনে হয় সরকার তার নেতিবাচক কাজের মাধ্যমে চরমপন্থীদের যেন উসকানি দিয়ে জানান দিয়ে যাচ্ছে- তোমরা প্রান্তিক চিন্তা লালন করো এবং মানুষ খুনের উল্লাসে মেতে ওঠো। একইভাবে অপহরণ ও গুমের বিস্তার ঘটছে। পৈতৃক শত্রুতার জন্য শিশু অপহৃত হচ্ছে। টাকার জন্য নারী-শিশু গুম হচ্ছে। দেশের রাজনীতিবিদেরা যখন ভিন্নমতের জন্য ইলিয়াস আলী কিংবা সালাহউদ্দিন হয়ে যাচ্ছেন, তখন বিপর্যয় ঠেকাবে কে?
এরিখ মারগোলিস একজন তত্ত্বীয় লেখক। নাইন-ইলেভেনের পর তার লেখা একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন- জুলুম-অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়ন, দুঃশাসন, অপশাসন ও অধিকার হরণের কারণে চরমপন্থী ও হঠকারী জন্ম নেয়। আগেই উল্লেখ করেছি, আমাদের দেশে বেশ কিছু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটল, যার সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণিত। অথচ সরকার দায় নিলো না। সরকারপ্রধান বললেন, পুলিশকে অস্ত্র দেয়া হয়েছে পকেটে রাখার জন্য নয়। জনগণ সরকারকে একেবারেই বিশ্বাসে নিলো না। ফল যা হওয়ার তাই হতে লাগল। এক সময় শুনলাম একজন কথিত পীর ও আরেকজন টিভি উপস্থাপক মাওলানাকে পরিকল্পিতভাবে জবাই করে হত্যা করা হলো। এখন পর্যন্ত সেই খুনের মোটিভ ও কাদের সংশ্লিষ্টতা এর সাথে রয়েছে তা খুঁজে পাওয়া গেল না। অথচ তোতাপাখির মতো পুলিশ-গোয়েন্দারা প্রমাণের আগে বিচারের মতো জঙ্গিবাদীদের দুষল, সেই জঙ্গিবাদীর চেহারা জাতি এখনো দেখল না। আরো দেখলাম কথিত ব্লগার হত্যার এক নিষ্ঠুরতা। ব্লগার মানে নাস্তিক, এটা বিশ্বাস করি না। কিছু রোমান্টিক তরুণ বয়সের দোষে, সমাজ-সভ্যতার অনাচারের কারণে সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে। এটা শুধু ব্লগার গোষ্ঠী ও শাহবাগী সম্প্রদায় কিংবা কথিত গণজাগরণ সংশ্লিষ্টতার জন্য নয়, এটা বিশেষ কোনো তরুণের কাজ হতে পারে। সব তরুণের নয়। এটা জ্ঞানের স্বল্পতা, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, জাতীয় শিক্ষানীতির সীমাবদ্ধতা, ধর্মীয় জ্ঞানের অপ্রতুলতা এবং বর্তমান সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের উদর থেকে জন্ম নিতে পারে। বাম ধারণার সেকেলে তত্ত্বীয় চিন্তায় ধর্মকে আফিম বলার জন্যও হতে পারে। যে কারণেই হোক এ ধরনের যে কেউ নাস্তিক হোক, বকধার্মিক হোক, হোক ভিন্নমতের লোক, কাউকে হত্যা করার এখতিয়ার মানুষের নেই। বিনা বিচারে হত্যার অধিকার রাষ্ট্রও পায় না। সরকার আইনের বাইরে হত্যার কোনো সুযোগ নিলে এ ধরনের খুন, হত্যা শুধু বৈধতা পায় না, উৎসাহিতও হয়। যার বিষময় ফলাফলের মুখোমুখি এখন আমরা এসে দাঁড়িয়েছি।
যে নবীন ভোটারটি ভোট দেয়ার অধিকার পেল না- তার ভোটাধিকার কেড়ে নিলো সরকার। বঞ্চিত সেই তরুণ ব্লগার কেন তার ব্লগে ক্ষোভ দেখাবে না। ধর্মের নামে কবরপূজা, ভণ্ডামিই বা সে সহ্য করতে যাবে কেন? তাই ক্ষেপে ওঠে, সব অনাচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে গিয়ে সংযম হারিয়ে ভুল করে বসে। মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাটা এখানেই। একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যাক, ঢাকা ও চট্টগ্রামের একজন তরুণ ভোট লুটপাটের ফসল এই মেয়রদের সম্মান করবে কেন। বিনা ভোটের এমপি-মন্ত্রীদের সমীহ করবে কেন। এর জন্য নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের জায়গা কই! তাহলে তারুণ্য ও সংক্ষুব্ধ মানুষের করণীয় কী? এর জবাবে বলব, তার পরও আইন হাতে তুলে নেয়া সঠিক হবে না।
এ ক্ষেত্রে একটি মৌলিক বিষয় হচ্ছে, আমরা যেকোনো মত লালন করতে পারি। নিজস্ব মতের প্রচারও করতে পারি। কিন্তু কিছু মত যখন অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, সংক্ষুব্ধ করে, চিরায়ত মূল্যবোধ ধ্বংস করে নৈতিক স্খলনকে বাড়িয়ে তোলে তখন সেই মত নিজে লালন করতে পারি, প্রচার করতে পারি না। যেমন- ধর্ম না মানা বা সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করা কোনো ভালো গুণ নয়। তার পরও কারো ভালো না লাগলে সেটা নিজের ভেতর রাখা সঙ্গত। প্রচার করে বেড়ালে অন্যের ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়, যা কোনো সভ্য জগৎ মেনে নেয় না। মেনে নিলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কতটা ভয়াবহ হয় তার তাৎক্ষণিক প্রমাণ ফ্রান্সসহ আজকের পশ্চিমা জগৎ। তা ছাড়া আমরা ভুলে যেতে পারি না- কোনো ধর্ম মন্দ নয়, কোনো প্রকৃত ধার্মিক অনাচার করে না। অনাচার কিংবা বাড়াবাড়ি করে নামসর্বস্ব মানুষ। যার নামটা ধর্মীয়, কর্মটা অধর্মের। এখানে যেকোনো ধর্ম সৃষ্টিকর্তা-নবী-রাসূল দায়হীন। তাদেরকে ক্ষোভের বিষয় বানাব কেন?
বাংলাদেশের মানুষ যে ধর্মই পালন করুক- অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে। একজন সৃষ্টিকর্তাকে মনেপ্রাণে জানে। ধর্ম আক্ষরিকভাবে পালন না করতে পারলেও ধর্ম নিয়ে কেউ অবজ্ঞা প্রদর্শন করুক, তা সহ্য করতে চায় না। আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও আইন ব্যক্তির এই ধর্মীয় অধিকার সংরক্ষণ করে। তার পরও যারা স্বঘোষিত নাস্তিক তাদের জন্য খুনের শাস্তি বরাদ্দ করে হত্যাকে বৈধ করে নেয়ার জন্য আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কারো নেই। থাকতে পারে না। তাই সবার জন্য নিরাপদ হবে নৈতিক বেষ্টনীর আলোকে ব্লাসফেমি ধরনের একটি আইন; যাতে খ্রিষ্টান, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কারো সৃষ্টিকর্তা, ধর্মাবতার ও নবী-রাসূল অজ্ঞ ও অবুঝদের কারণে আক্রান্ত না হন।
আর যাদের ন্যূনতম বিশ্বাস কিংবা ঈমান আছে তারা ধর্ম পুরোটা না জানলেও, না মানলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকে নিজের জন্য বৈধ করে নিতে পারে না। কোনোকালেই কোনো ভালো কাজ খারাপ পদ্ধতিতে হয় না, হবে না। এ সত্যটি সবার আগে ক্ষমতা তস্কর সরকারের নীতিনির্ধারকদের মগজে নেয়া উচিত।
এখন ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ হচ্ছে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করা। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ঠেকাতে হবে। ধর্মের নামে মতান্ধতা গ্রহণযোগ্য নয়। আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকারের নামে নাস্তিকতা প্রচার, নবী-রাসূলদের অসম্মান বৈধ হতে পারে না। যে বা যারা এমন অপকর্ম করে তার নাম ব্লগার হোক, হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, হোক খ্রিষ্টান-ইহুদি কিংবা বৌদ্ধ কারো ধর্মাচারকে কটাক্ষ করার অধিকার কাউকে দেয়া যেতে পারে না।
অপারেশন ক্লিনহার্ট থেকে অপারেশন ডার্টি হার্ট অর্থাৎ বিরোধী দল নির্মূল অভিযান কোনোটাই কোনোকালে সমর্থন করতে পারিনি, আজও নয়। বিচারবহির্ভূত যেকোনো হত্যাই জুলুম। এ জুলুম বন্ধ করতে হলে সরকারের সদিচ্ছা জরুরি। প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যা, খুন, গুম, অপহরণের পর আমরা মাতম করব- সুফল পাবো না। বরং এর ফলে আরো একটি হত্যাকে উসকানি দেয়া হবে। কেউ ব্লগার মেরে উল্লাস করবে। কেউ জামায়াত-শিবির মেরে প্রেতের মতো অট্টহাসিতে ফেটে পড়বে। ভিন্নমতের রাজনীতিবিদকে নাই করে দিয়ে কেউ দাবি করবে রাজনৈতিক সাফল্য। এর পরিণাম শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ হতে বাধ্য। সরকার নিজে সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে ইনসাফ ও আইনের খেলাপ এই মহাপাপাচার বন্ধ হবে না।

writer : masud2151@gmail.com

পাতাটি ৩৪৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন