logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo ক্ষয়রোগে আক্রান্ত গণতন্ত্র : সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক
আজ বুধবার, ২০ মে ২০১৫। আজ থেকে ১৯ বছর আগে, ঠিক এই দিনে ২০ মে ১৯৯৬, সেই আমলের বাংলাদেশে একটি আধা-সাংবিধানিক আধা-সামরিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল। সঙ্কটের দু’টি পক্ষ দাঁড়িয়েছিল। একপক্ষে ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এবং অপরপক্ষে ছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান। এরূপ সঙ্কটে ইতোপূর্বে বাংলাদেশ কোনো দিন পড়েনি। ওই সঙ্কট দু’দিন স্থায়ী ছিল। ২০ মে ১৯৯৬ রাত ১১টার মধ্যে সঙ্কট থেকে সাময়িক উত্তরণ ঘটেছিল। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে আরো দুই-তিন সপ্তাহ সময় লেগেছিল। ওই সঙ্কট নিয়ে আমি ইতোপূর্বে কিছু কিছু কলাম লিখেছি বিভিন্ন পত্রিকায়। ১৯৯৮ সালের মে মাসের ৯ তারিখ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের তোপখানা রোডে অবস্থিত সিরডাপ মিলনায়তনে একটি গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করেছিলাম। ওই গোলটেবিল আলোচনার বিষয় বা শিরোনাম ছিল : ‘বাংলাদেশের সংবিধান, বাংলাদেশের শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো এবং তাহাদের জন্য প্রযোজ্য মানবাধিকার।’ আলোচ্য বিষয় বা আলোচনার শিরোনাম পর্যালোচনা করলে পাঠক বুঝতে পারবেন আসলে কোন বিষয়টি আলোচনা হচ্ছিল। ওই মে মাসের ৯ তারিখের গোলটেবিল আলোচনায় আমি মূল পেপার বা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলাম। পুরো আলোচনা সভা আয়োজনে এবং সার্বিকভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার কাজে আমরা ১৫ জন সাবেক সেনাবাহিনীর অফিসার জড়িত ছিলাম। ওই ১৫ জন অফিসারের মধ্যে আটজন ছিলেন বাধ্যতামূলকভাবে অবসরপ্রাপ্ত এবং সাতজন বরখাস্তকৃত। বাধ্যতামূলক অবসরের ইংরেজি পরিভাষা হলো কম্পালসরিলি রিটায়ার্ড। বরখাস্তকৃতের ইংরেজি পরিভাষা হলো ডিসমিস্ড। এরূপ ব্যতিক্রমধর্মী আলোচনা সভা ইতোপূর্বে কোনো দিন কোনো সংগঠন কর্তৃক আয়োজন করা হয়নি। আমরা আয়োজন করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এজন্য যে, আমরা মনে করেছিলাম আমাদের ওপর অন্যায় করা হয়েছে। আমাদের ব্যাখ্যা ছিল নিম্নরূপ : রাজনৈতিক কারণেই আমরা বঞ্চনা বা অন্যায়ের শিকার হয়েছিলাম। আমাদের মনের অভিব্যক্তি ছিল যে আমরা সবাই গণতন্ত্রের প্রতি অনুগত। গণতন্ত্রের প্রতি অনুগত নয় এমন কিছু মহল আমাদের বিপথে পরিচালিত করতে চেয়েছিল এবং আরো কিছু গণতন্ত্র-বিমুখ মহল আমাদের বিপদগ্রস্ত করেছিল। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আজকে ২০ মে ২০১৫ আমার সাপ্তাহিক কলামে এ ঘটনার উল্লেখ করে কলাম শুরু করলাম একটি কারণে। কারণটি হলো, ১৯৯৬ সালে যেমন গণতন্ত্রের জন্য অনুগতপ্রাণ ছিলাম, এখন ২০১৫ সালেও গণতন্ত্রের জন্য অনুগতপ্রাণ। ১৯৯৬ সালের ঘটনা প্রসঙ্গে অনেক বেশি বই লেখা হয়নি; মাত্র দুটি পূর্ণাঙ্গ বই এবং দু’একটি বইয়ে আংশিক বর্ণনা। আমার ভাষ্য উল্লেখ আছে আমার জীবনে লেখা প্রথম বইয়ে (বইয়ের নাম : সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে আটাশ বছর) এবং আমার লেখা এগারোতম বইয়ে (বইয়ের নাম : মিশ্র কথন)।

কলাম শিরোনামের ব্যাখ্যা
আজকের কলামের শিরোনাম ক্ষয়রোগে আক্রান্ত গণতন্ত্র। অনেক দিন আগে নয়, কিছু দিন আগেও যক্ষ্মা রোগকে ক্ষয়রোগ বলা হতো। কিছু দিন আগে পর্যন্ত ধারণা ছিল- যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই; মানে যক্ষ্মা রোগ হলে নির্ঘাত মৃত্যু, কারণ তার সুচিকিৎসা নেই। আমি চট্টগ্রামের সন্তান এবং ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলাম। আমাদের কলেজ গেট থেকে ৫০০ মিটার দক্ষিণে প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশে সলিমপুর নামক স্থানে একটি যক্ষ্মা রোগের হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র ছিল। ছোট ছোট একতলা ঘর ছিল যেগুলো ওয়ার্ডের মতো। হাসপাতাল এবং বঙ্গপোসাগরের মধ্যে দূরত্ব ছিল এক কিলোমিটারের কম। সমুদ্রের নির্মল লবণাক্ত বাতাস যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য সহায়ক ছিল বলেই ওইরূপ স্থানে নিরাময়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। মূল কথায় ফিরে আসি। এখন যক্ষ্মারোগ চিকিৎসার মাধ্যমে আরোগ্যযোগ্য। যক্ষ্মারোগকে আর ক্ষয়রোগ বলা হয় না। এখন রাজনৈতিক পরিভাষায় এই কলামের শিরোনামের ব্যাখ্যা দিচ্ছি। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের যক্ষ্মারোগ হয়েছে। এই রোগের চিকিৎসা দরকার। এই চিকিৎসা শুধু মুখের কথায় হবে না। এর চিকিৎসার জন্য পরিস্থিতি অনুধাবন করতে হবে এবং কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। আজকের কলামে এ বিষয়টিকে শুধু উপস্থাপন করছি; বিস্তারিত আলোচনা আগামী তিন সপ্তাহের তিনটি কলামে করব ইনশাআল্লাহ।

২৮ এপ্রিলে গণতন্ত্রের চর্চা
২৯ এপ্রিল ২০১৫ ঢাকা মহানগর থেকে প্রকাশিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার একটিতে শিরোনাম ছিল, ‘জিতল আওয়ামী লীগ, হারল গণতন্ত্র।’ এমন হৃদয়গ্রাহী শিরোনাম সব পত্রিকায় ছিল না। বেশির ভাগ পত্রিকায় শিরোনাম ছিল বিএনপির নির্বাচন বর্জন বা আওয়ামী লীগের জয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যেই শিরোনামটি উদ্ধৃত করলাম, ওই একটি শিরোনামই যথেষ্ট, দেশবাসীকে এবং বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যে, ২৮ এপ্রিল ২০১৫ গণতান্ত্রিক চর্চার নামে বাংলাদেশে কী হয়েছে!
২৮ এপ্রিল ২০১৫ বাংলাদেশে তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করে। জামায়াতের কয়েকজন কাউন্সিলর ওই জয়ের তালিকায় রয়েছেন। বিএনপির কয়েকজন কাউন্সিলরও ওই নির্বাচনে জয়লাভ করেন। যদিও বিএনপি ওই নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, তথাপি যেসব বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর অনুকূলে ফল প্রকাশ করা হয়েছে তারা আইনগতভাবে বহাল থাকতে পারেন। এর কারণ হলো, এটা রাজনৈতিক প্রত্যাহার, এটা আইনগত প্রত্যাহার নয়। আইনগত প্রত্যাহারের তারিখ তিন বা সাড়ে তিন সপ্তাহ আগে পার হয়ে গেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এবং মাঝামাঝি পর্যায়ে গণতন্ত্রের পক্ষ থেকে দু-চারটি কথা পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাই। ৩০ এপ্রিল ২০১৫ যুগান্তর পত্রিকার একটি শিরোনাম ছিল, ‘বর্জনেও অর্জন দেখছে বিএনপি।’ আমি এই শিরোনামটির তত্ত্বের সঙ্গে একমত। কারণ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কারণে ; ১. গণতন্ত্রের প্রতি তার ও তার দলের আনুগত্য প্রমাণের জন্য। ২. এই নির্বাচনে জিতলেও বিএনপির কৌশলগত লাভ এবং হারলেও বিএনপির কৌশলগত লাভ। এ ভাবনা থেকেই বিএনপি অর্থাৎ ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এখন প্রশ্ন হলো বর্জনেও অর্জন তত্ত্বে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের অর্জন কতটুকু? অর্জন হচ্ছে, বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা যে, এই সরকারের প্রভাবাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। ২০১৩ সালের বিভিন্ন সময়ে দেশে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, পাঁচটির একটিতেও জয়লাভ করতে পারেনি। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সরকার আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীদের অনুকূলে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার পরেও বিজয়ের দেখা পায়নি। তখন কথা ওঠে যে, সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে; দেশের জনগণ আর এ সরকারকে চায় না; সরকারের পরিবর্তন চায় জনগণ। এতে আওয়ামী লীগের টনক নড়ে এবং আওয়ামী লীগ এ থেকে শিক্ষা নেয় এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, যেকোনো প্রকারেই হোক ঢাকা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাদের জিততেই হবে। এটা তাদের প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রেস্টিজ ইস্যুকে সামনে রেখেই আওয়ামী লীগ যেকোনো প্রকারেই হোক তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিজয়ের মুকুটটি তাদের ঝুলিতেই রেখে দেয়। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রাজনৈতিক দল কোনটি থাকবে আর কোনটি থাকবে না- এর কোনো দিকনির্দেশনা বা সিদ্ধান্ত এতে থাকে না। যদি তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনটিতেই বিরোধী দল জয়লাভ করত বা দু’টিতে বা একটিতেও জয় লাভ করতে, তা হলেও কথা উঠত- সরকারের জনপ্রিয়তা প্রশ্নের সম্মুখীন। কিন্তু ওই জনপ্রিয়তা হারানোর কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সরকার বদল হতো না কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং জনগণের মনে এই বিষয়টি দাগ কাটত। অপর দিকে, নির্বাচনকে দারুণভাবে প্রভাবান্বিত করে বা হস্তক্ষেপ করে নির্বাচনকালে নির্বাচন কমিশনকে অকার্যকর রেখে, নিজেদের রাজনৈতিক কর্মীদের নির্বাচনী কাজে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করে, প্রশাসনকেও দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করে সরকার পৃথিবীর সামনে যে উদাহরণ সৃষ্টি করল, তার মাধ্যমে এটা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে সিটি করপোরেশন নির্বাচনই যেখানে প্রশ্নের সম্মুখীন, সেখানে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে কী হতে পারে সেটা বেশ সহজেই অনুমেয়।
৫ জানুয়ারি ২০১৫’র পর স্বচ্ছতা দেখানোর সুযোগ

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের আচরণভঙ্গি পৃথিবীর সামনে যেভাবে দেখিয়েছিল তার থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি সুযোগ অবশ্য তারা পেয়েছিল। যে সুযোগটি ছিল উপজেলা নির্বাচনে। উপজেলা নির্বাচন পাঁচটি ধাপে সম্পন্ন হয়। পাঁচটি ধাপের মধ্যে প্রথম দু’টি ধাপে সরকার কিছুটা নমনীয় এবং স্বচ্ছতা দেখালেও পরের ধাপগুলোতে আর পারেনি। ফলে তাদের সেই পুরনো বদনামের কালিমাটি ধুয়েমুছে পরিষ্কার করা হয়ে ওঠেনি। অভিযোগের তীরটি তাদের ঘাড়েই রয়ে গেল। এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও একটি সুযোগ ছিল কিন্তু সে সুযোগটিকেও তারা কাজে লাগাতে পারেনি। পরিকল্পিতভাবেই তারা সে সুযোগটিকে নষ্ট করল। সুতরাং নির্বাচন প্রশ্নে ক্ষমতাসীন সরকারকে প্রশ্নের আবর্তেই থাকতে হলো। অতএব, জনগণের কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ক্ষমতাসীন সরকারের স্নেহধন্য একটি অকার্যকর, ভীত, স্বচ্ছতাহীন নির্বাচন কমিশন দিয়ে দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।

ক্ষমতাসীন সরকার যেসব কাজ করতে পারে
পৃথিবীর সামনে স্পষ্টতই প্রতীয়মান যে, গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ২০ দলীয় জোট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু তাদের সেই আন্তরিকতাকে বর্তমান সরকার ও তার নির্বাচন কমিশন স্বাগত জানাতে পারেনি। ২০ দলীয় জোটকে বাধ্য করা হয় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে। কারণ ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন সরকার তাদের তীব্রভাবেই কোণঠাসা করে রাখে। ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হন। প্রচারাভিযানে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করা হয়। রাস্তায় ফেলে পেটানো হয় বেগম জিয়ার নিরাপত্তা রক্ষীকে। এমনকি নির্বাচনের দিন বিএনপি কোনো পোলিং এজেন্ট দিতে পারেনি। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সরকারের আক্রমণাত্মক অবস্থা দেখে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো পোলিং এজেন্ট ভোটকেন্দ্রে যেতে সাহস পায়নি। এতসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে ২০ দলীয় জোটের নির্বাচন বর্জন ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। পৃথিবী কী দেখল? পৃথিবী দেখল যে, আওয়ামী লীগ সরকার অনেক শক্তভাবে ঘাঁটি গেড়ে ক্ষমতায় আসীন রয়েছে এবং তারা মিডিয়াকে দমন করতে পারে, প্রশাসনকে শতভাগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তারা সেনাবাহিনীকে মার্জিনে রেখেও তাদের দিয়ে খেলতে পারে, অর্থের বিনিময়ে সব সোচ্চার মহলকে কিনে নিতে পারে। এর যা কিছুই পৃথিবী দেখেছে এর মধ্যেও দু’টি দিক রয়েছে। এতে করে কিছু লোক আওয়ামী লীগকে অতীতের তুলনায় বেশি ভয় পেয়ে থাকবে। আওয়ামী লীগ যে গণতন্ত্রের ক্ষতি করেই চলেছে এ ক্ষতিকে কিভাবে রোধ করা যায় কিছু লোক এ নিয়ে তৎপর হবে। পৃথিবীর লোকজন বাংলাদেশের মানুষের কষ্ট কতটুকু বোঝে বা বোঝে না, এটা তত্ত্বের বা আলোচনার বিষয়। পৃথিবীর মানুষের কাছে বাংলাদেশের একটি মর্যাদা আছে। বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ এবং বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উঠে আসছে। এটি অবশ্যই পৃথিবীর কাছে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এই বাংলাদেশেই যদি গণতন্ত্রকে পদদলিত করে একনায়কতন্ত্রের পরিস্ফুটন ঘটে, তাহলে এর পরিণতি ভবিষ্যতে অত্যন্ত খারাপ আকার ধারণ করতে পারে। এ পরিণতিতে বাংলাদেশে যদি উগ্রবাদ বা চরমপন্থা উঠে আসে, তাহলে সেটা কারো জন্যই সুখকর হবে না। অতএব বিশ্বের যেসব দেশের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে, শ্রম ও মেধার সম্পর্ক আছে এবং যেসব দেশের সাথে রাজনৈতিক সুসম্পর্ক রয়েছে, সেসব দেশ বা দেশের জনগণ বাংলাদেশ নিয়ে শঙ্কিত থাকবে এবং সম্পর্ক খারাপের দিকেই এগোতে থাকবে। এটা কখনোই কাম্য হতে পারে না। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতে গণতন্ত্রকে পরাজিত করে শুধু বাংলাদেশেরই ক্ষতি করেনি, দীর্ঘ মেয়াদে তারা নিজেদেরও ক্ষতি করেছে। রাজনৈতিক মাঠে প্রতিপক্ষ লাগে কিন্তু যদি কোনো প্রতিপক্ষ না থাকে তাহলে দলের ভেতর থেকেই প্রতিপক্ষ সৃষ্টির সম্ভাবনা থেকে যায়।

সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা
সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঠিকমতো করলেই বা করতে পারলেই গণতন্ত্রের ক্ষয় রহিত হতো না। গণতন্ত্রের ক্ষয় রহিত করতে হলে অনেক আঙ্গিকে অনেক কাজ করতে হবে। একটি উদাহরণ দিই ছাত্র অঙ্গন থেকে। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় হলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির সূতিকাগার। ১৯৯০-এর পরে আজ ২০১৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের বৃহত্তম ও সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নির্বাচন হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনের নাম ডাকসু। সেই ডাকসু নির্বাচন হয় না প্রায় আড়াই দশক ধরে। এর জন্য কে দায়ী? এর জন্য সমগ্র দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের মুরব্বি তথা গুরুজন যারা তারাই দায়ী। অনেকেই অভিযোগ করে বলছেন যে, জ্যেষ্ঠ নেতারা চাচ্ছেন না, তরুণরা এসে স্থান দখল করুক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুতে সভাপতি হচ্ছেন পদাধিকারবলে ভিসি বা তার প্রতিনিধি। সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন নির্বাচিত ছাত্র। যিনি ডাকসু ভিপি ও সাধারণ সম্পাদক হবেন বা তাদের কেবিনেটে বা পরিষদে অন্যান্য নির্বাচিত ছাত্ররা রাজনীতির অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণভাবে চিহ্নিত হন। তারা পছন্দের রাজনৈতিক দলে প্রবেশের একটা অধিকার পান। ডাকসু নির্বাচনের অভাবে এই প্রক্রিয়া বন্ধ। শুধু উদাহরণস্বরূপ এটি বললাম। গণতন্ত্রের ক্ষয়রোধ করতে হলে আরো একটি প্রক্রিয়া শক্তিশালীভাবে চালু রাখতে হয় এবং চালু রাখতে হবে। সেই প্রক্রিয়ার নাম হলো সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা। আমি একটু রক্ষণশীল ভঙ্গিতেই বলব, এটা আমার নিজের দল বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি হোক বা জোটভুক্ত অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম দল হোক, এই প্রক্রিয়া অতি প্রয়োজনীয়। মঙ্গলবার ১২ মে সন্ধ্যার পর বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সাথে বেগম খালেদা জিয়ার মতবিনিময় সভা ছিল। আমি বিএনপির বাইরে থেকে একজন মেহমান হিসেবে উপস্থিত ছিলাম; কারণ আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেনাবাহিনী থেকে অবসর পাওয়ার প্রথম বছর ছিল এলপিআর। তারপর শুরু হয় উন্মুক্ত জীবন। উন্মুক্ত জীবনের সাড়ে সতেরো বছর আমি এসব মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের সাথে একত্রে চলাফেরা উঠাবসা করেছি এবং এখনো অব্যাহত রেখেছি। সেই মতবিনিময় সভায় আমি আত্মসমালোচনার সুর দেখতে পেয়ে স্বস্তি বোধ করেছি। আমার মূল্যায়নে আগামী দিনে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় প্রতিটি দল যদি নিজেরা শক্তিশালী না হয়, তাহলে সারা দেশ শক্তিশালী হবে না।


লেখক : মেজর জেনারেল অব: সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

পাতাটি ২৬৪ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন