logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি : তীব্র শীতে কাঁপছে উত্তরাঞ্চল : গরিব-দুঃখী মানুষের অসহনীয় দুর্ভোগ
রাজশাহীসহ গোটা উত্তরাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ আর তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ক্রমেই শীতের তীব্রতা বাড়ছে। গতকাল রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আর্দ্রতা ছিল সকাল ৬টায় ৯৭ শতাংশ এবং সন্ধ্যা ৬টায় ৫১ শতাংশ ছিল। এর আগের দিন তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতের তীব্রতায় গোটা উত্তরাঞ্চল কাঁপছে। প্রচণ্ড শীতে গরিব-দুখী ও ছিন্নমূল মানুষের অসহনীয় দুর্ভোগ। কুয়াশার পরিমাণ কম থাকলেও তাপমাত্রা কমার সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকায় শীতের তীব্রতা বাড়ছে বলে জানায় রাজশাহী আবহাওয়া অফিস। আর শীত বাড়ায় নগরীর ফুটপাত এবং অভিজাত মার্কেটের গরম কাপড়ের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। বিশেষ করে গতকাল ফুটপাতের দোকানে গরিব ও মধ্যবিত্তদের প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এদিকে উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র ও ছিন্নমূল ৫০ লাখ লোকের জন্য সরকারিভাবে মাত্র ৭১ হাজার কম্বল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ক’দিনের শীতের কারণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোল্ড ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
গতকালই দেড় শতাধিক রোগী ভর্তি হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, আরও ক’দিন এ অবস্থা থাকতে পারে। দিনের তাপমাত্রা আরও হ্রাস পেতে পারে।
তীব্র শীতের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ এখন শীতবস্ত্রের দোকানগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। তবে গত দু-তিন দিনে শীতবস্ত্রের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। সাধারণ ছিন্নমূল মানুষের জন্য এসব শীতবস্ত্র কেনা এখন নাগালের বাইরে। রাজশাহী জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, রাজশাহীতে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৭শ’ কম্বল এসেছে। এর মধ্যে জেলার ৯ উপজেলায় ইউএনওদের মাধ্যমে এসব কম্বল ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। নগরীতে সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৭০৫টি কম্বল এসেছে বলে রাসিক সূত্র জানিয়েছে।
রাজশাহী নগরীর ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তাদের ব্যবসা এখন আগের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক সপ্তাহ আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭শ’ টাকা বিক্রি হতো, সেখানে এখন বিক্রি হচ্ছে দেড় থেকে ১০-১২ হাজার টাকা। রাজশাহী আবহাওয়া অফিস সূত্র মতে, গত ৫-৬ দিন থেকে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রা অব্যাহতভাবে কমছে।
আবহাওয়া অফিস আরও জানায়, প্রতি দিনই তাপমাত্রা কমছে। এ মাসে সাধারণত এটা হয়ে থাকে। আগামী ২-১ দিন তাপমাত্রা আরও কমতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে গতকাল নগরীর বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশনসহ কয়েকটি বস্তি এলাকায় ঘুরে অতিরিক্ত শীতে নিম্নবিত্ত ও ছিন্নমূল মানুষের দুর্ভোগ চিত্র চোখে পড়েছে। রাজশাহী বাসস্ট্যান্ড এলাকার ছিন্নমূল রফিকুল (৪৫), নুরজান বেওয়া (৩৩) ও আকলিমাসহ (৪২) আরও অনেকে জানান, গত ক’দিনের তীব্র শীতে তাদের ভীষণ কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। রাতে এবং সকালের দিকে মাঝে মধ্যে তারা রাস্তার কাগজ কুড়িয়ে জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে ঠাণ্ডা দূর করার চেষ্টা করছেন। তবে আগুন ফুরিয়ে গেলে আবারও সেই শীতের কবলে পড়তে হচ্ছে। নগরীর কোর্ট স্টেশন, বুলনপুর, শিরোইল কলোনি, ছোট বনগ্রাম এলাকার মানুষদেরও একই দুর্ভোগ পোহাতে হলেও এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কেউই তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি।
এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা প্রশাসক শেফাউল করিম বলেন, এবার গরিব-দুখীদের জন্য প্রচুর পরিমাণ শীতবস্ত্র পাওয়া গেছে। সেগুলো উপজেলা পর্যায় ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বিতরণ করা হচ্ছে।
তবে উত্তরাঞ্চলে ১৬টি জেলায় প্রায় ৫০ লাখ দরিদ্র মানুষের কোনো শীতবস্ত্র নেই। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী এসব মানুষের অধিকাংশই ভাসমান, ভূমিহীন ও নিঃস্ব। এসব মানুষ এবারের হাড় কাঁপানো শীতে ভয়াবহ কষ্ট পাচ্ছে। এ অঞ্চলের অতিগরিব ২৫ লাখ মানুষের অধিকাংশই শীতবস্ত্রের নামে যা ব্যবহার করছে তা হলো—ছেড়াকাটা কাঁথা, চট-ছালা, অতি পুরনো কাপড়সহ নানা ধরনের বস্ত্র, যা কোনোভাবেই শীতবস্ত্র নয়।
সরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০০৫ সালে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিহীন, অতিদরিদ্র ও ছিন্নমূল পরিবারে যে জরিপ চালানো হয়েছে তাতে দেখা গেছে, তীব্র শীতের সময় ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিবারে দিনে গড় আয় ১০০-১২৫ টাকা। আর এ কারণেই দারিদ্র্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী ওইসব পরিবারের লোকজনের পক্ষে কোনোভাবেই দৈনন্দিন খাবার সংগ্রহের পর শীতবস্ত্র কেনার পয়সা থাকছে না। এ কারণেই তারা শীত নিবারণের জন্য যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছে তা হলো কোনো অগ্নিকুণ্ড, চট, ছালা, খড়ের লেপসহ নানা ধরনের বস্ত্র। শীত নিবারণের জন্য যেগুলো কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
সরকারি ওই পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, পাবনা জেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবার রয়েছে ৩৫ হাজার ৯২৪টি। ওইসব পরিবারে শীতবস্ত্রহীন মানুষ রয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৪০ জন। পাবনা জেলায় ভূমিহীনের হার ৯.৮ ভাগ। নদীভাঙন আর নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত সিরাজগঞ্জে দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবার রয়েছে ১৪ হাজার ৭১৯টি। ওই জেলায় শীতবস্ত্রের অভাবে খুব কষ্ট পাচ্ছেন ৫৩ হাজার ৫৯৫ জন। সিরাজগঞ্জে ভূমিহীনের হার হল ৮.৫ ভাগ। ওই জেলায় নদীভাঙনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অধিকাংশ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অন্য এলাকায় চলে যায় বলে বেশিরভাগ ছিন্নমূল এবং অতিদরিদ্র মানুষকে তাদের ঠিকানায় পাওয়া যায় না।
নওগাঁ জেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবারের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৫৬টি। ওইসব পরিবারে শীতবস্ত্রের অভাবে আছে ৭৮ হাজার ২৪০ জন। নওগাঁয় ভূমিহীনের হার ৩.৮ ভাগ। ওই জেলায় এবারের প্রচণ্ড শীতে কষ্ট পাচ্ছেন ১ লাখ ১ হাজার ৪শ’ মানুষ। এই জেলায় ভূমিহীনের হার ৭.৮ ভাগ।
ভারতের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবারের সংখ্যা হলো ২ হাজার ৫৫৬টি। ওইসব পরিবারে শীতবস্ত্রের অভাবে আছে ১২ হাজার ৭৭৫ জন। ওই জেলায় ভূমিহীনের হার ৮.৭ ভাগ। বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবার রয়েছে ২৪ হাজার ৮৫৭টি। ওই জেলায় শীতবস্ত্রের অভাবে ভুগছে অতিদরিদ্র পরিবারের ১ লাখ ২৪ হাজার ২৮৫ জন। রাজশাহীতে ভূমিহীনের হার ৬.৭ ভাগ।
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম অভাবি এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেলা গাইবান্ধায় দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবার রয়েছে ৪৫ হাজার ৩৬৪টি। ওইসব পরিবারের ২ লাখ ৬ হাজার ৮২০ জন এবারের প্রবল শীতে যন্ত্রণা সহ্য করছে। এসব মানুষের অধিকাংশই নামমাত্র শীতবস্ত্র ব্যবহার করে। গাইবান্ধায় ভূমিহীনের হার ১০.৮ ভাগ।
কুড়িগ্রামে দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবার রয়েছে ৩৩ হাজার ৮৪০টি। ওই জেলায় এবারের প্রবল শীতে কষ্ট পাচ্ছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ২শ’ জন। যাদের অধিকাংশের গায়েই নেই কোনো শীতবস্ত্র। কুড়িগ্রামে ভূমিহীনের হার ১১ ভাগ।
নীলফামারীতে দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবার রয়েছে ৭৫ হাজার ৪৭৪টি। ওই জেলায় এবারে প্রবল শীতে ভুগছে ২ লাখ ৬২ হাজার ২৭৫ জন। নীলফামারীতে ভূমিহীনের হার ১৯.৫ ভাগ। লালমনিরহাট জেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবার রয়েছে ৩২ হাজার ৯শ’টি। ওই জেলায় এবারের শীতে কষ্ট পাচ্ছেন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫শ’ জন, যাদের প্রায় সবাই অতিদরিদ্র, ছিন্নমূল ও ভূমিহীন। লালমনিরহাট জেলায় ভূমিহীনের হার ১৭.৫ ভাগ। রংপুরে দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবার রয়েছে ৭৫ হাজার ৭৭৪টি। ওই জেলায় এবারের প্রবল শীতে ভুগছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৮৭০ জন। এসব মানুষের অধিকাংশই বন্যা, নদীভাঙন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিঃস্ব হয়ে গেছে। রংপুরে ভূমিহীনের হার ১৭.৩ ভাগ।
উত্তরের জেলা দিনাজপুরেও এ বছর প্রবল শীত পড়েছে। সেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবার রয়েছে ৭৪ হাজার ৫২৪টি। ওই জেলায় এবারের হাড় কাঁপানো শীতে কাঁপছে ৩ লাখ ৭২ হাজার ১২০ জন। এই জেলায় ভূমিহীনের হার ১৩.৮ ভাগ। দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ২৮ হাজার ৯৪৪টি। ওইসব পরিবারে শীতবস্ত্রহীন মানুষ রয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭২০ জন। ওই জেলায় ভূমিহীনের হার ২০.১ ভাগ।
এদিকে সরকারি পরিসংখ্যানে উত্তরাঞ্চলে ২৫ লাখ অতিদরিদ্র মানুষের হিসাব থাকলেও শীতবস্ত্র বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৭১ হাজার কম্বল, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। তবে দরিদ্র মানুষের প্রকৃত সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে জানা গেছে। এবার বেসরকারিভাবে এখনও শীতার্ত মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণে কোনো প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসেনি।

পাতাটি ২৯৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন