logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo নেমে যাচ্ছে পানির স্তর, সরে যাচ্ছে পদ্মা নদী
ধান চাষের জন্য ঠিকঠাক আল বাঁধা আছে কিন্তু জমিতে কোনো ধান নেই। ঘাসও মরে বাদামি হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও গরু-ছাগল চরে বেড়াচ্ছে। অথচ পার হয়ে যাচ্ছে আমনের মৌসুম। এই দৃশ্য রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নের বৈদ্যপুর গ্রামের। সেখানকার কৃষকেরা জানান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় তানোর উপজেলার দুটি ইউনিয়নের প্রায় সাত হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে বৃষ্টির পানিতে শুধু আমন ধান হতো, বৃষ্টি না হওয়ায় এবার তাও হয়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে রাজশাহীতে বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে। আর পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। পানির প্রবাহ হ্রাস পেয়ে চর পড়ে পদ্মা নদী রাজশাহী শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে সরে গিয়ে একটি ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ফসল ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। তানোর ও গোদাগাড়ি উপজেলায় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
গত ২৮ অক্টোবর বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিএমডিএর পক্ষ থেকে তানোর উপজেলার মুণ্ডুমালা পৌর এলাকাসহ তিনটি ইউনিয়নের কৃষকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ধানের চাষে পানি বেশি লাগে, বিশেষ করে বোরো ধানে। কৃষকেরা যেন এমন ফসলের চাষ করেন, যাতে পানি কম লাগে। চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়ে বিএমডিএর তানোর উপজেলার সহকারী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ধান চাষ না করে অন্য ফসল করলে শুধু পানিই কম খরচ হবে তা নয়, বিদ্যুতের খরচও কমবে। সম্প্রতি এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তানোরের কলমা ইউনিয়নের চৈতপুর, আদিবাসীপাড়া, দিব্যস্থল, কন্দপুর, বলদিপাড়া, সংকরপুর গ্রাম এবং বাধাইড় ইউনিয়নের জৈতগোকুল, জৈগিবাড়ি, রামজেদপুর, ঝিনাখোর, গোলাকান্দা, ঝিনাপাড়া, ধামধুম, চকপারুলীসহ মাড়িয়া গ্রামের কয়েক হাজার কৃষকের জায়গাজমি থাকা সত্ত্বেও তারা জীবন-মরণ সমস্যায় ভুগছেন। তাঁরা শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে একটি আমন ফসল ঘরে তুলতেন। এবার বৃষ্টিপাত সময়মতো না হওয়ায় আমন ধানের চাষও তাঁরা করতে পারেননি। জানা গেছে, পানির স্তর বেশি নিচে নেমে যাওয়ায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এই এলাকাকে তাদের সেচের আওতায় রাখেনি।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার ঝিনাখোর গ্রামের কৃষক তাহের আলী বলেন, এখন চলছে বিজ্ঞানের যুগ। আর আমরা মান্ধাতা আমলের কৃষক হয়ে বৃষ্টির আশায় বসে থাকি। তিন ফসলি জমিতে কোনোমতে একটি ফসল পাই। এবার তাও হয়নি। জমি থাকতেও পানির অভাবে আবাদ করতে পারছি না।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পানিবিজ্ঞান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে এ বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কম হয়েছে। ২০০৭ সালের ১ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩০১ মিলিমিটার। ২০০৮ সালে ওই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩৩৭ মিলিমিটার। এবার হয়েছে মাত্র ১০১ মিলিমিটার।
একদিকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। গত বছর ১৮ মে রাজশাহী পাউবোর আয়োজনে ‘প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প’ শীর্ষক সেমিনারে পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান এক প্রতিবেদনে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ার একটি চিত্র তুলে ধরেন। এতে রাজশাহীর গোদাগাড়ির মাটিকাটা ইউনিয়নে ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ক্রমেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের নিম্নগামিতার চিত্র দেখা যায়। এতে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে পানির স্তর নিম্নগামী হতে হতে ২০০৫ সালে প্রায় চার মিটারেরও বেশি নিচে নেমে এসেছে। তবে এর মধ্যে ২০০০ সালে পানির স্তর একটু ওপরে উঠেছিল। তাও ১৯৯৬ সালের উচ্চতার নিচেই ছিল।
রাজশাহী পাউবোর পানিবিজ্ঞান বিভাগের গোদাগাড়িতে বসানো ‘৮০-রাজ’ কূপের পরিমাপ অনুযায়ী, গত ২০০৮ সালের মে মাসের চেয়ে এ বছরের মে মাসে ভূগর্ভস্থ পানির তল ৪০ সেন্টিমিটার নিচে নেমে গেছে।
সরে যাচ্ছে পদ্মা: এদিকে আজ থেকে দুই বছর আগে রাজশাহীতে এসে যাঁরা শহরের পাশে পদ্মার ঢেউ দেখেছিলেন, এখন সেখানে কোনো নদীই নেই। যত দূর চোখ যায়, কাশবন, ধৈঞ্চার ক্ষেত, জঙ্গল, গাছগাছড়া আর বালুচর। রাজশাহী শহরের কাছে প্রায় চার কিলোমিটার চর ফেলে পদ্মা নদী সরে গেছে দক্ষিণে। গত চার-পাঁচ বছরে ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন হলেও এবার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা হয়েছে। এতে বদলে গেছে রাজশাহী শহরের আবহাওয়া।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম বলেন, যে পদ্মার বুকে কোনো চর ছিল না, সেখানে এখন বিরাট চর জেগেছে। এটা হচ্ছে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে। আগে প্রবল স্রোতের সঙ্গে পলি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত। এখন আর সেটা হচ্ছে না। মাঝখানে চর ফেলে একাধিক ক্ষীণ ধারায় আঁকাবাঁকা হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
রাজশাহী পাউবো সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। গত বছর ২১ জুলাই পদ্মায় পানির প্রবাহ ছিল নয় লাখ ৯২ হাজার ৩৭৮ কিউসেক। ওই মাসেরই ২৮ তারিখে এই প্রবাহ ছিল ১১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৪৬ কিউসেক। অথচ এ বছর ২০ জুলাই পানির সেই প্রবাহ কমে হয়েছে মাত্র দুই লাখ ৬৪ হাজার ১১৩ কিউসেক।
একদিকে যেমন পদ্মা নদী সরে যাওয়ায় রাজশাহীর আবহাওয়ার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, অন্য দিকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় রুক্ষ্ম হয়ে যাচ্ছে এখানকার আবহাওয়া।

পাতাটি ৩৬৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন