logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo হরতাল শান্তিপূর্ণ : লাশ নিয়ে মিছিলের চেষ্টা, জামায়াত-শিবিরের ৭ জন রিমান্ডে
রাজশাহীতে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির ডাকা আধাবেলা হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। নগরীর দুএকটি জায়গায় বিএনপি নেতাকর্মীদের দেখা গেলেও কোনো মিছিল সমাবেশ হয় নি। ভারি যানবাহন ছাড়া নগরীতে ভোর থেকে অন্য যানবাহন চলাচল করেছে। নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় হঠাৎ ১ মিনিটের জন্য মিছিল বের করে জামায়াত। পুলিশ সেখানে উপস্থিত হওয়ার আগে তারা পালিয়ে যায়।

সোমবারের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। দুটি মামলার বাদী হয়েছেন নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার উপপরিদর্শক হাফিজুর রহমান। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন উপপরিদর্শক ইমাউল হক। গতকাল মঙ্গলবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গ্রেফতার ৭ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়েছেন। আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার নিহত শিবিরকর্মীর লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ময়না তদন্ত শেষে নিহতের লাশ পুলিশ প্রহরায় বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। আসরের নামাজের পর পুলিশ প্রহরায় লাশ দাফন করা হয়।

সোমবার নগরীতে বিএনপির গণমিছিল কর্মসূচির দিন জামায়াত-শিবিরকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনার পর গতকাল বিএনপি আধাবেলা হরতালের ডাক দেয়। বিএনপির আহ্বান করা হরতালের কারণে গতকাল সকাল থেকে পুলিশ নগরীর বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেয়। নগরীজুড়ে গড়ে তোলা হয় নিরাপত্তা বলয়। নগরীর সাহেববাজার, জিরোপয়েন্ট, মনিচত্বর, সোনাদিঘীর মোড়, গৌরহাঙ্গা রেলগেট, বিনোদপুর, তালাইমারি, ভদ্রা, কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বাস টার্মিনাল, লক্ষ্মীপুর মোড়, কোর্ট, শালবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ভারি যানবাহন চলাচল না করলেও রিকশা-ভ্যান, সাইকেলসহ হালকা যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিলো। রাজশাহী রেলস্টেশন থেকে সকালে নীলফামারির উদ্দেশ্যে তিতুমীর, খুলনার উদ্দেশ্যে সাগরদাড়ি, রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে মধুমতি ও ঢাকার উদ্দেশ্যে সিল্কসিটি আন্তঃনগর ট্রেন যথাসময়ে ছেড়ে গেছে। এছাড়া রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিলো। হরতালের শেষ সময় পর্যন্ত নগরীতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায় নি।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার হুমায়ন কবীর জানান, সকাল ৬টা থেকেই মহানগরীজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। হরতালকে কেন্দ্র করে মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ।

পুলিশ-জামায়াত সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা : নগরীতে পুলিশ ও জামায়াত-শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ এবং এক শিবিরকর্মী নিহতের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। সোমবার রাতে পুলিশ বাদী হয়ে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা দুটি করে। দুটি মামলায় জামায়াত-শিবিরের প্রায় ২ হাজার নেতাকর্মীকে আসামী করা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন বোয়ালিয়া মডেল থানার উপপরিদর্শক হাফিজুর রহমান।

বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ জানায়, নগরীতে বিএনপির গণমিছিল কর্মসূচির সময় পুলিশের ওপর জামায়াত-শিবিরের হামলার ঘটনায় একটি ও গুলিতে শিবিরকর্মী শফিকুল ইসলাম নিহত হওয়ার ঘটনায় আরেকটি মামলা হয়েছে। দুটি মামলার বাদী হয়েছে পুলিশ। মামলায় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের আসামী করা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার দিন নগরীর লোকনাথ স্কুলের সামনে সড়ক অবরোধ করে লোক ও যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গেলে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে পুলিশ সদস্যরা আহত হন। এরপর পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে। তারা ছত্রভঙ্গ না হয়ে পুলিশের ওপর ককটেলসহ বিভিন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। জামায়াত-শিবিরের আক্রমনে তাদের কর্মী শফিকুল ইসলাম আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ এ সময় ৫৮টি টিয়ারসেল ও ২২৮টি শর্টগানের গুলি ছোড়ে।

মামলায় আসামী করা হয়েছে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শিবিরের সভাপতি আবদুল বাতেন, সিভিলের সপ্তম পর্বের ছাত্র ও শিবিরের সেক্রেটারি আশরাফুল ইসলাম, পাওয়ার পঞ্চম পর্বের নাবিকুল, রাজশাহী কলেজ শিবিরের সভাপতি শাহ আলম, রাজশাহী কলেজ ছাত্রাবাস শিবিরের সভাপতি রাসেল, রাজশাহী কলেজ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোজাফ্ফর হোসেন, ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী আরকো, নগরীর ষষ্ঠিপাড়ার জার্মান, নিশান, নগরীর হেতেম খাঁ সবজিপাড়ার রবি, রাজার হাতার ডিকো, হেতেম খাঁর কারিগর পাড়ার জীবন, সুলতান, রতন, তেরখাদিয়া এলাকার হেনা, মহিলা কলেজের সামনের ছবি, নিউমার্কেট এলাকার আল ফাহাদ আল কাফি, কয়েস, টিকাপাড়া এলাকার রাজন, বসুয়া অচিনতলা এলাকার শফিকুল ইসলাম, হান্না, মধ্য ধরমপুর এলাকার সেলিম, ধরমপুর এলাকার জাফর বাবু, মতিহার থানার শ্যামপুর নতুনপাড়া এলাকার মাজেদুর রহমানসহ অজ্ঞাত ৮০০-৯০০ জনকে। অন্য মামলাটিতেও একই ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ ৮০০-৯০০ জনকে আসামী করা হয়েছে।

সাত আসামী রিমান্ডে : হত্যা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া পৃথক দুটি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জামায়াত-শিবিরের ৭ কর্মীকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল গ্রেফতার হওয়া ৭ আসামীকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক ইমাউল হক। আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে নেয়া আসামীরা হলো সাইরুল, জহুরুল, রাসেল, মোমিনুল, দুলাল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বোয়ালিয়া মডেল থানার উপপরিদর্শক ইমাউল হক জানান, পুলিশের ওপর হামলা, গুলিতে শিবিরকর্মীর মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে জানতে ওই ৭ জনকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

লাশের ময়না তদন্ত : নিহত শিবিরকর্মী শফিকুল ইসলামের লাশের ময়না তদন্ত গতকাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্পন্ন করা হয়েছে। ডা. মুনসুর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বোর্ড গঠন করে ময়না তদন্ত করা হয়েছে। বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন ডা. রওশন নেওয়াজ ও ডা. জিনাত। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক ডা. মুনসুর রহমান জানান, যে অস্ত্রের গুলিতে শফিকুল ইসলামের মৃত্যু হয়েছে তা ছিলো ‘স্মল আর্মস’। পিস্তল বা রিভলবার হতে পারে। বুলেটটি সামনে দিয়ে ঢুকে শিরদাঁড়া দিয়ে বের হয়ে গেছে। বেড়িয়ে যাওয়ার সময় রক্তনালিটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাৎক্ষণিক তার মৃত্যু হয়েছে। তবে বুলেটটি যেহেতু নিহতের শরীরে ছিলো না এ কারণে তা পুলিশের না কি বাইরের কারো এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হন নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ময়না তদন্ত দলের একজন চিকিৎসক জানান, যে বুলেটে শফিকুল ইসলামের মৃত্যু হয়েছে সেটি শক্তিশালী বুলেট ছিলো।

এদিকে ময়না তদন্ত শেষে পুলিশ প্রহরায় নিহত শিবিরকর্মী শফিকুল ইসলামের লাশ তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। ময়না তদন্ত শেষে লাশ নিয়ে মিছিলের চেষ্টা করে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা। তবে পুলিশ তাদের বিক্ষোভ করতে দেয় নি। এ সময় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরকর্মীদের লাশ নিয়ে টানাটানির ঘটনা ঘটে। দুপুরে পুলিশ প্রহরায় লাশ নিহত শফিকুলের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। সেখানেও বিক্ষোভ করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। পরে আসরের নামাজের পর জানাজা শেষে নিহত শফিকুলের লাশ নগরীর হেতেম খাঁ গোরস্থানে দাফন করা হয়।

জানাজায় বিএনপির যুগ্মমহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু, মহানগর জামায়াতের আমীর আতাউর রহমান, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন, মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ, মহানগর যুবদল আহ্বায়ক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ডা. মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও ইমাজ উদ্দীন ম-ল, অফিস সেক্রেটারি আসম মামুন শাহীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন বলে নগর জামায়াতের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

পাতাটি ২৮৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন