logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo নগরীতে হবে জাদুঘর, বক্তারা দিলেন নীতিমালার তাগিদ
রাজশাহী মহানগর জাদুঘর স্থাপনে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা। জাদুঘর কেমন হবে, কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি সব বিষয় থাকবে নীতিমালার মধ্যে। রাজশাহী মহানগর জাদুঘর স্থাপন উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বক্তারা বলেন, একটি দেশের সভ্যতার মূল ভিত্তি হচ্ছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এগুলোর সঠিক সংরক্ষণের অভাবে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে দেখা দিতে পারে নানা রকম বিভ্রান্তি। অনেক দেরিতে হলেও রাজশাহী মহানগরীর ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাসিক যে উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রসংশার দাবি রাখে। বক্তারা জাদুঘর স্থাপনে তাদের নানারকম পরামর্শ তুলে ধরেন। সেইসঙ্গে সিটি করপোরেশনকে এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
রাসিকের ইতিহাস, পুরাকীর্তি সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়ন স্থায়ী কমিটির সভাপতি আনসার আলীর সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। অন্যান্যের ধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক সুলতান মাহমুদ, প্রবীণ শিক্ষক রুহুল আমিন প্রামাণিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান, প্রবীণ সাংবাদিক মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম, রাসিকের প্যানেল মেয়র সরিফুল ইসলাম বাবু, সোনার দেশ সম্পাদক অধ্যাপক ফজলুল হক, সোনালী সংবাদের সম্পাদক লিয়াকত আলী, বরেন্দ্র জাদুঘরের সাবেক পরিচালক সাইফুদ্দিন চৌধুরী, ফেরদৌস হাসান রানা, আবদুস সামাদ ম-ল প্রমুখ। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আজাহার আলী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাসিক মেয়র বলেন, আমাদের সভ্যতার ইতিহাস হাজার বছরের। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে তুলে ধরার লক্ষ্যে মহানগর জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন গর্ব করতে পারে আমাদের ইতিহাস নিয়ে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, সম্মিলিত যেকোনো উদ্যোগ অবশ্যই সফলতা লাভ করে। ভালো কাজ কোনো সময় আটকে থাকে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে নগরবাসীর সহযোগিতায় রাজশাহী শিশু হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। যা সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। একইভাবে ব্লাড ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ সফল হতে চলেছে। মহানগর জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ সফল হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মেয়র আরো বলেন, রাজশাহীর পুরাকীর্তিসমূহ সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বড়কুঠির ঐতিহ্য বজায় রেখে সংস্কারের মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। একজন বিদেশি বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছেন। এতে করে বড়কুঠি একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ শুধু সাড়ে তিনশ বছরের পুরাতন এ স্থাপনা দেখার জন্য ছুটে আসবে। এছাড়াও ঐতিহ্যবাহী স্কুল কলেজ, মসজিদ মন্দির, ভবন পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সংগৃহীত বিভিন্ন উপকরণ নগর ভবনের একটি কক্ষে সংরক্ষিত করা হবে। পরবর্তীতে একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। তিনি জাদুঘর স্থাপনে নগরবাসীর কাছ থেকে উপকরণ আহ্বান করে বলেন, সবাই সবাইকে এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করে মতামত তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামাল, সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু, ড. সুজিত সরকার, মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী, সাংবাদিক আবু সালেহ মোহাম্মদ ফাত্তাহ, মকবুল হোসেন, রাসিকের সচিব কেএম আবদুস সালাম প্রমুখ।
মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন : মতবিনিময় সভার শুরুতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ইমরাতের অবস্থা এবং করণীয় বিষয় উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি যে সব প্রতœ-ইমারত সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা প্রয়োজন তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করেন।
দরগা মসজিদ, সাহেববাজার বড় মসজদি, মাহদীপুর মসজিদ, হেতেম খা বড় ও ছোট মসজিদ এ শহরের পুরাতন মসজিদ যদিও বর্তমানে সবগুলো পুনর্নির্মিত হয়েছে। এগুলো ছাড়াও রাজশাহী মহানগরীতে অনেক পুরকীর্তি বা প্রতœ-ইমারত হিসেবে মন্দির ও লোকায়ত ইমারত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে। এসবের মধ্যে কিছু ইমারত পরিত্যক্ত ও অর্ধভগ্ন, কতকগুলো ধ্বংস করে নবনির্মিত, কতকগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন, আবার কতকগুলো ইতোমধ্যে মূল ইমারতের বৈশিষ্ট্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে আধুনিক উপাদানে সংস্কারকৃত।
এ হিসেবে রাজশাহীতে রয়েছে তিন ধরনের ইমারত ও স্থাপনা। নগরীতে পরিত্যক্ত ইমারত যেগুলো জরুরিভিত্তিতে সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বালিয়াপুকুর ঈদগাহ (সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত), সপুরা মঠ (সপুরা ছয়ঘাটি পুকুরের উত্তর পাড়ে অবস্থিত), সপুরা শিবমন্দির (সপুরা সিল্কমিলের পাশে অবস্থিত), সপুরা শিবমন্দির (সপুরা চাতালে অবস্থিত), সপুরা শিবমন্দির (পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশে), শিরোইল মঠ, কাজলা চৌচালা মন্দির, ঘোড়ামারা অষ্টভুজাকৃতি শিবমন্দির, বড়কুঠি (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন), কাজলা কুঠি, ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর একাডেমি ভবন (বড়কুঠি পাড়ায় অবস্থিত)। এই ইমারতগুলো সহজেই সিটি করপোরেশন জরুরিভিত্তিতে সংস্কারের মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
ব্যক্তিগত অথবা সমষ্টিগত মালিকানাধীন ইমারতগুলোর মধ্যে রয়েছে ফুদকিপাড়া শিবমন্দির, ঘোড়ামারা জোড়া শিবমন্দির, লালজী আখড়ার রাধা-কৃষ্ণ ও শিবমন্দির (সাগরপাড়া ও রাণীবাজার রাস্তা সংলগ্ন গৃহাভ্যন্তরে), হনুমান জিউ আখড়া মন্দির, জৈন মন্দির, হড়গ্রাম পদ্মকামিনী এস্টেট এর মন্দির কমপ্লেক্স, গণকপাড়া ধর্মসভা মন্দির, জোড়াকালী মন্দির (মালোপাড়া) এবং মোহিনীমোহন স্মৃতি মন্দির, সপুরা। এই শ্রেণির ইমারতগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং কতকগুলো গৃহ অভ্যন্তরে অবস্থিত। আবার কিছু ইমারত সমষ্টিগতভাবে ব্যবহৃত ও পরিচালিত। এসব ইমারত সংশ্লিষ্ট মালিকদের ব্যবহারের পথ খোলা রেখে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে।
বিভিন্ন অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন ইমারতগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরাতন মাদ্রাসা ভবন (পরিত্যক্ত), রাজশাহী কলেজের সতেরো নম্বর গ্যালারি ও ফুলার ভবন, হেমন্তকুমারী হোস্টেল, পরিত্যক্ত মুনসেফ কোর্ট ভবন, লাল কুঠি (বড়কুঠি পাড়া), পানসি পাড়া জমিদারদের কুঠি (বর্তমান বোয়ালিয়া অফিসার্স ক্লাব), রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার (মিয়াপাড়া), সরকার বাড়ি (রাণীবাজার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়), ব্রিটিশ কাউন্সিল ভবন ও মিশন হাসপাতাল। এ ইমারতগুলো বিভিন্ন অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে। এসব ইমারত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তাদেরকে যথাযথভাবে সংরক্ষণের পরামর্শ দিতে হবে। এছাড়া সিটি করপোরেশন সেগুলো সংস্কারের মাধ্যমে তাদের হেফাজতে রাখতে পারে। এছাড়া নগরীর মাজারগুলোর কর্তৃপক্ষকে মাজারের সৌন্দর্যবর্ধন, সংরক্ষণ ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে পরামর্শ বা দিকনির্দেশনা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে উপস্থাপনে উল্লেখ করা হয়। যাতে পর্যটক ও ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিরা নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খলার সঙ্গে এসব মাজার পরিদর্শন করতে পারেন।

পাতাটি ২৯৭ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন