logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo পদ্মা ইসলামী লাইফে সীমাহীন দুর্নীতি, গ্রাহকরা ঝুঁকিতে
পরিচালকদের আর্থিক অনিয়ম, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের টাকা আত্মসাৎসহ নানা আর্থিক অনিয়মে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন পদ্মা ইসলামী লাইফের লাখ লাখ গ্রাহক। কোম্পানিটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও একটি ব্যবস্থাপনা পর্ষদ থাকলেও তা আছে নামেমাত্র। মূলত কোম্পানির আয়-ব্যয় ও নির্বাহী কর্মকা-ের সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন পরিচালকরা। আর এ আধিপত্যকে কাজে লাগিয়ে বীমা আইন অমান্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা।

লোকসানে থাকার পরও মিথ্যা তথ্য দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত লভ্যাংশ ঘোষণা, অবৈধ ভ্রমণভাতা ও মিটিং ফি, জমি ক্রয় ও পদ্মা ভবন তৈরিতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে পরিচালকদের বিরুদ্ধে। এ পরিচালকরা হলেন-আবু তাহের, ওবায়দুর রহমান, এবিএম জাফর উল্লাহ, এবিএম তালেব আলী, ডা. নাদেরা সাবেরিন, ইঞ্জিনিয়ার আবুল বাশার, ইউসুফ ওয়াজেদ আলী চৌধুরী, নাজিম উদ্দিন জয়নাল আবেদীন জাফর, আবদুল মান্নান চৌধুরী, এটিএম রফিক, আবদুল মান্নান পাটোয়ারী প্রমুখ। এরা কোম্পানি থেকে নগদ টাকা নিয়ে পরবর্তীতে তা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সমন্বয় করে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরিচালকরা ২০০৮ সালে সর্বমোট নগদ ৯৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা তুলে নেন। এর মধ্যে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন জোনাল অফিসে সম্মেলন বাবদ উন্নয়ন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ও কোম্পানির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে ৩১ লাখ ১৯ হাজার টাকা তুলে নেন। এর মধ্যে উন্নয়ন কর্মকর্তাদের ২০০৭ সালের বেতন-ভাতা, কমিশন বাবদ ৬৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা এবং ২০০৯ সালে ক্যালেন্ডার ক্রয় বাবদ ২৯ লাখ টাকা ভুয়া ব্যয় দেখিয়ে সমন্বয় করা হয়। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যেসব কর্মকর্তার নামে বেতন-ভাতা দেখানো হয়েছে তারা সে সময়ে কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন না। এরা হলেন- এএমডি পদে শাহজামাল ও হাজি শাহজামাল, মিজানুর রহমান, জাকির হোসেন, এসইডি পদে গোলাম জাকরিয়া ম-ল, মনিরুজ্জামান প্রমুখ। একইভাবে এর মধ্যে পরিচালক ড. এবিএম জাফর উল্লাহ ১৪ বারে নগদ টাকা নিয়েছেন ১০ লাখ ৪২ হাজার। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০০৯ সালে নগদ তুলে নেন ৩০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। এ টাকাও উন্নয়ন কর্মকর্তাদের নামে বোনাস বাবদ সমন্বয় দেখানো হয়। উপরন্তু বীমা আইনে বোর্ড সভা বাবদ ৫ হাজার টাকার বেশি সম্মানী নেয়া অবৈধ হলেও তা মানছেন না পরিচালকরা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরিচালকরা মিটিং ফি ও জ্বালানি বাবদ ২০০৯ সালে ৪২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা এবং ২০১০ সালে ২২ লাখ ৯২ হাজার টাকা অবৈধভাবে তুলে নেন। এসবের বাইরে বীমা আইন ভেঙে যার যার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগও উঠেছে এসব পরিচালকের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, কোম্পানির পরিচালক জয়নাল আবেদীন জাফরের আত্মীয়ের আল-মানার হাসপাতাল নামে এক প্রতিষ্ঠানের ২ কোটি ২০ লাখ টাকার শেয়ার কেনা হয়েছে। এছাড়া ২০১০ সালে আজম সিকিউরিটিজ ও ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ড নামের দুটি ব্রোকারেজ হাউজে ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। আর তা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় বর্তমান চেয়ারম্যান আবু তাহেরকে। অভিযোগ রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ থেকে লাভ-লোকসানের কোনো হিসাব পরিচালকরা গত দুই বছরেও কোম্পানিতে দাখিল করে নি। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে পরিচালকদের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোম্পানির নামে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ১০৫ শতাংশ জমির প্রকৃত মূল্য ১ কোটি ৮ লাখ টাকা হলে তা ক্রয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। একই অঞ্চলে ৬৩ শতাংশ ও ৩৭ শতাংশের অপর দুটি জমির ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত মূল্য ধরা হয়েছে ২৫ লাখ এবং ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

অন্যদিকে নগদে লেনদেনের নিয়ম না থাকলেও বগুড়া সদরে ৬৭ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে নগদ টাকায়। এ জমির মূল্য ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া সিলেটে চারটি স্থানে জমি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ একটি প্লটের প্রকৃত মূল্য ছিল ৬০ লাখ টাকা। অথচ ক্রয় মূল্য দেখানো হয়েছে ৮৪ লাখ টাকা। একইভাবে সিলেটের অপর তিনটি জমি ও লক্ষ্মীপুরের ক্রয় মূল্য বেশি করে দেখানো হয়েছে ১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এসব কারণে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালকদের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সেইসঙ্গে পরিচালকদের অর্থদ- সংক্রান্ত নির্দেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ মামলাটি পরিচালনারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক এ সংস্থা। গত বৃহস্পতিবার কর্তৃপক্ষের সাপ্তাহিক বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গত বছর মে মাসে উচ্চ আদালতের এ স্থগিতাদেশ মামলাটি নিষ্পত্তি করার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে অর্থমন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হয়। বাংলানিউজ।

পদ্মা লাইফের অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে গিয়ে পরিচালকদের মাধ্যমে ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ খুঁজে পায় বিলুপ্ত অধিদফতরের নিয়োজিত অডিট ফার্ম। তদন্ত প্রতিবেদনে ২ কোটি ১২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে পরিচালকদের জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়। এ অভিযোগে কোম্পানির চেয়ারম্যানসহ প্রত্যেক পরিচালককে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করে বিলুপ্ত অধিদফতর। সেইসঙ্গে জরিমানা ও তহবিল তছরুপের সমপরিমাণ টাকা বিগত ২০০৭ সালের ৩১ মে ও জুন মাসের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেয়। এছাড়া জরিমানার টাকা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হলে আরো ৫০ হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতিদিনের জন্য ১০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়। পরবর্তীতে এ নির্দেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট মামলা করে কোম্পানিটি।

পদ্মা লাইফ ২০০৪ সাল পর্যন্ত অ্যাকচুরিয়াল ভ্যালুয়েশন রিপোর্টে ৮ কোটি টাকার বেশি লোকসানের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করলেও পরিচালকরা তাদের মূলধন ৩ কোটি টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে লভ্যাংশ বাবদ ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা তুলে নেয়। ৩টি খাতে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোম্পানির একাধিক প্রকল্প থেকে ওই পরিমাণ টাকা পরিচালকরা তুলে নিয়েছেন। একইভাবে ২০০৯ ও ২০১০ সালে ১৬ কোটি টাকা ভুয়া প্রিমিয়াম আয় দেখিয়েও ১৫ শতাংশ হারে ৪ কোটি টাকা লভ্যাংশ তুলে নেন পরিচালকরা। এ প্রসঙ্গে পদ্মা লাইফের পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে অবশেষে পাওয়া যায় ওবায়দুর রহমান নামে এক পরিচালককে। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমি কোম্পানিতে কম যাই, তাই কিছু বলতে পারছি না। তবে কিছু অনিয়ম হয়েছে, সে বিষয়গুলো নিয়ে আমরাও অভিযোগ করেছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা এসব অনিয়মে জড়িত।’ পদ্মা ইসলামী লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম রব্বানী চৌধুরী বলেন, ‘২০০৭ সালের ঘটনার সময়ে আমি ছিলাম না। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে নগদে লেনদেনের বিষয়টি কোম্পানির প্রয়োজনেই করা হয়েছে।’ তবে ৩০ লাখ টাকা নগদে তোলার বিষয়টি স্বীকার করলেও তা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

পাতাটি ২৯৩ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন