logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo রাজশাহীর রাজনীতি : নিষ্প্রভ চারনেতা
রাজশাহীর রাজনীতিতে চারনেতা বিভিন্ন সময় বড় ভূমিকা পালন করেছেন। দলের হয়ে সংসদ নির্বাচনে তারা অংশ নিয়ে দলকে জয় এনে দিয়েছেন। কেউ কেউ মন্ত্রিত্বও পেয়েছেন। রাজশাহীর রাজনীতির এই চারনেতার দুজন বিএনপির কবীর হোসেন দলীয় মনোনয়নে ও আওয়ামী লীগের সরদার আমজাদ হোসেন স্বতন্ত্র হয়ে গত সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। দুজনই পরাজিত হয়েছেন। ব্যারিস্টার আমিনুল হক একাধিক মামলার আসামী হয়ে পলাতক থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন নি। তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক দলের মনোনয়ন পান নি। বয়স ও নতুন নেতৃত্বের কাছে পরাজয়ের কারণে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অবসান ঘটছে বলে নেতাকর্মীরা ধারণা করছেন।

আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা সরদার আমজাদ হোসেন বঙ্গবন্ধুর সময়েই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী হন। পরে তিনি আবারো ফিরে আসেন আওয়ামী লীগে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে দলের ভেতরে ও বাইরে আলোচনায় ছিলেন তিনি। ২০০৬ সালে তাকে দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিলো রাজশাহী-৪ আসনে। তবে ওই নির্বাচন বাতিল হলে দলীয় কর্মকা-ে শুরু থেকে তৎপর ছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে দল তাকে মনোনয়ন দেয় নি। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হন এনামুল হক। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন সরদার আমজাদ। এরপর থেকে আর রাজনীতির মাঠে নেই এই প্রবীণ নেতা। মাঝে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন। এখন বাড়িতে বসে সময় কাটছে তার।

সরদার আমজাদ হোসেন এখন তার ঢাকার বাড়িতে অবস্থান করছেন। বেশ কিছুদিন ধরেই শারীরিকভাবে অসুস্থ। রাজনীতির মাঠে তার ফেরার সম্ভাবনাও ক্ষীণ বলে উল্লেখ করেছেন তার ঘনিষ্ঠরা। গতকাল মঙ্গলবার সরদার আমজাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অপারেশনের পর হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছেন। এখন বিছানা থেকে উঠে খাবার টেবিলে বসতে পারছেন।

বিএনপি নেতা এবং সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক রাজনীতিতে আসার পর থেকে নানাভাবে আলোচনায় ছিলেন। ১৯৯১ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়ে মন্ত্রিত্ব লাভ করেন। এরপর আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী হন। ক্ষমতায় থাকতে আলোচনায় থাকার পাশাপাশি বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও আলোচনায় ছিলেন তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে জঙ্গি মদদদানের অভিযোগে মামলা হয়। একটি মামলায় আদালতে তার সাজা হয়। এ নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় আলোচনায় ছিলেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে পলাতক থাকায় মনোনয়ন পান নি। তার পরিবর্তে ওই আসনে নির্বাচন করেন তার বড় ভাই পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এনামুল হক।

দলীয় নেতারা জানান, আগে ব্যারিস্টার আমিনুল হক নিয়মিত তার নির্বাচনী এলাকায় আসলেও এখন খুব একটা আসেন না। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকেন স্থানীয় নেতারা। রাজনীতির মাঠের চেয়ে ঢাকার আদালতে এখন সময় দেন বেশি। গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকাকালে ত্রাণের টিন, মুক্তিযোদ্ধা তালিকা, টেলিফোন লাইন স্থাপন, কাবিখা প্রকল্পে দুর্র্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক। এছাড়া মন্ত্রীর ভাইয়ের এনজিও ব্যবসা ও মন্ত্রীর মামা রফিকুল ইসলামের দাপটে অতীষ্ট ছিলো সাধারণ মানুষ। গত নির্বাচনে যার ফল পেয়েছেন তার ভাই বিএনপি প্রার্থী এনামুল হক। এনামুল হকের পরাজয়কে ওই এলাকার মানুষ ব্যারিস্টার আমিনুল হকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বলে দেখছেন।’ এনামুল হকের পরাজয় ছাড়াও তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির একটি অংশ সব সময় আমিনুল হকের পারিবারিক রাজনীতির বিরোধিতা করে আসছে। তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিশ মোহাম্মদের মৃত্যু তাকে আরো বেকায়দায় ফেলেছে বলে দলের নেতারা মনে করেন।

এ নিয়ে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার আমিনুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতির মাঠে নেই এ কথা ঠিক নয়। বেশি কিছু জানতে হলে ঢাকায় আসতে হবে।’

বিএনপি নেতা কবীর হোসেন রাজনীতির মাঠে সব সময় আলোচনায় ছিলেন। নগর রাজনীতিতে বিএনপির যুগ্মমহাসচিব মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে, দলীয় প্রধানকে কালো পতাকা দেখিয়ে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। বিএনপির হয়ে জেলার একাধিক আসন থেকে নির্বাচন করেছেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি মেরাজ উদ্দিন মোল্লার কাছে। এরপর থেকে মাঠের রাজনীতিতে নেই তিনি। বিএনপির রাজনীতিতে অনেকের ‘গুরু’ হিসেবে পরিচিত কবীর হোসেনের সময় কাটে এখন বাড়িতে বসে। দলের নেতারা খুব একটা যান না তার কাছে। দলীয় কোনো কর্মসূচিতে তিনি অংশ নেন না।

বিএনপির প্রবীণ নেতা কবীর হোসেন রাজশাহী-২ আসন থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০১ সালে রাজশাহী-৫ (এখন রাজশাহী-৬) আসন থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। দলীয় সূত্র জানায়, ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর কারণে কবীর হোসেন দলের ভেতরে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। প্রথমে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয় নি। পরে রাজশাহী-৫ আসনে কবীর হোসেনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ওই আসনে তিনি ৮৮ হাজার ১৭৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। গত নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয় পবা ও মোহনপুর উপজেলা নিয়ে নবগঠিত রাজশাহী-৩ আসনে। সেখানে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রার্থী হন মহানগর জামায়াতের আমীর আতাউর রহমান। কবীর হোসেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মেরাজ উদ্দিন মোল্লার কাছে পরাজিত হন।

কবীর হোসেনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির বেশকিছু নেতা তাকে সংসদ নির্বাচনে আর মনোনয়ন না দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও দল তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু তিনি বিজয়ী হতে না পারায় দলের ওই অংশটি তার বিরুদ্ধে আরো শক্ত অবস্থান নেয়। ফলে কবীর হোসেন রাজনীতিতে আর সক্রিয় হতে পারেন নি। এছাড়া তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার কারণে দলটির একাংশ ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এতে করে কবীর হোসেনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অবসান ঘটেছে বলে তার ঘনিষ্ঠরা মনে করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা বিএনপির এক নেতা জানান, কবীর হোসেন দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ। তিনি নিজে চলতে পারেন না। গত নির্বাচনে রাজশাহীর ৬টি আসনে বিএনপির ভরাডুবির কারণে আগামীতে দলকে টেনে তুলতে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। সেখানে কবীর হোসেনের মতো প্রবীণ নেতার স্থান নাও থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তবে কবীর হোসেন রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা বলতে চান নি। তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থ মানুষ। এসব নিয়ে কথা বলতে পারবো না।’

আওয়ামী লীগ নেতা তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালে দলের মনোনয়ন পেলেও জয়লাভ করতে পারেন নি। এরপর ২০০৫ সালের কাউন্সিলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়ে আলোচনায় চলে আসেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেয়েও আলোচনায় ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ দারাকে। এরপর থেকে রাজনীতিতে নি®প্রভ তাজুল ফারুক। দলের কোনো কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায় না। এরই মধ্যে ২০০৫ সালের কাউন্সিলে গঠন করা জেলা কমিটি অনুমোদিত হয়েছে। তবে তার সভাপতি পদটি আর নেই। অনুমোদিত কমিটিতে সভাপতি হয়েছেন সংসদ সদস্য মেরাজ উদ্দিন মোল্লা।

তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক দাবি করেন, ‘যেভাবে আমাকে কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে, তা নিয়মের মধ্যে পড়ে না। নির্বাচিত কমিটির সভাপতিকে বাদ দিয়ে সাধারণ সম্পাদককে রাখা হয়েছে।’ মাঠে আছেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘দলের কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও আমার নির্বাচনী এলাকায় যাই।’

পাতাটি ৬২৩ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন