logo

   

বিস্তারিত সংবাদ

News Photo ‘ঘরের শত্রু’র ভয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র
একাধিক গ্রেপ্তারের ঘটনা, স্বীকারোক্তি ও অনুসন্ধানের পর সন্ত্রাস দমন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ধারণা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মুসলিমদের তুলনায় ইউরোপের মুসলিম তরুণদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বেশি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের একটি বড় অংশ শিক্ষিত, সচেতন ও ধনবান। সন্ত্রাসবাদ যে অগ্রগতি-প্রগতির বিপক্ষে, তা তারা বেশ ভালোমতোই বোঝে। আর সেখানকার মুসলিম কমিউনিটির নেতা ও ইমাম সাহেবেরা এ ব্যাপারে বেশ সক্রিয় ও সতর্ক। পরিবারের কোনো তরুণ সদস্য কিছুদিনের জন্য লাপাত্তা হলেই তাঁরা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খবর দেন। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজটা বেশ সহজ হয়।
তবে গত এক বছরের কিছু ঘটনা ভিন্ন ধারণার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে পাকিস্তানে মার্কিন পাঁচ তরুণের গ্রেপ্তারের ঘটনা সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। এটাকে দেখা হচ্ছে ‘অভ্যন্তরীণ হুমকি’ হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্দার্ন ভার্জিনিয়ার এই পাঁচ তরুণ সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়ে অভিযুক্ত। প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা সরাসরি বলেছেন, মার্কিন তরুণদের কেউ কেউ পাকিস্তান-আফগানিস্তান বা অন্য কোথাও প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা প্রশিক্ষণ ও সাহস পাচ্ছেন সরাসরি আল-কায়েদার কাছ থেকে। এঁদের কেউ কেউ পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জড়িত।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে অভিবাসী লোকের সংখ্যা বাড়ছে, আর বিশ্বব্যাপী যেভাবে ইসলামী কট্টরপন্থীদের সংখ্যা বাড়ছে এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পরে যুক্তরাষ্ট্র ও এর সহযোগীরা যেভাবে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে, তাতে মার্কিন মুসলিমদের হাতে একটি ‘অভ্যন্তরীণ হামলা’ ঘটার আশঙ্কাও বেড়েছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক সজ্জন গোহেল মনে করছেন, কয়েক বছর আগে ব্রিটেনের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রও সেই অভিজ্ঞতা গ্রহণের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে সজ্জন গোহেল ২০০৫ সালের ৭ জুলাই ভোরে লন্ডনের পাতালরেল ও যাত্রীবাহী বাসে হামলার কথা বলেছেন। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত কয়েকজন ব্রিটিশ তরুণ ওই হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে। তাতে নিহত হয়েছিল ৫২ জন। বিষয়টি উল্লেখ করে গোহেল বলছেন, ২০০৪ সালের আগে ব্রিটিশ তরুণদের অনেকে বিদেশে সন্ত্রাসবাদের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ইসরায়েল ও দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে হামলার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। এর দুই বছর পরে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিনদের সঙ্গে ব্রিটিশ সৈন্যরা যুদ্ধ করলে ক্ষুব্ধ হন ওই ব্রিটিশ মুসলিম তরুণেরা। ব্রিটেনে চারটি বোমা হামলার পরিকল্পনা ছিল আল-কায়েদার। কিন্তু তা ফাঁস হয়ে যায়। আর এর পরই ঘটে ওই ৭ জুলাইয়ের হামলা।
ব্রিটিশ গোয়েন্দাপ্রধান ২০০৬ ও ২০০৭ সালে কমপক্ষে ২০০ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে দুই হাজার ব্রিটিশ তরুণের সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা করেছিলেন, যা তিনি দেখেছেন নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে। সেই মতো সে দেশে বসবাসরত আট লাখ পাকিস্তানির দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই দুই হাজার তরুণের প্রকৃত অবস্থান এখন কর্তৃপক্ষের অজানা।
জঙ্গি মার্কিনরা: পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ভার্জিনিয়ার যে পাঁচ তরুণ গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনজন আল-কায়েদার একজন রিক্রুটারের (জঙ্গি নিয়োগদাতা) সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাকি দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো স্পষ্ট নয়।
আর নাজিবুল্লাহ জাজি (২৪) নামে ডেনভারের এক ট্যাক্সিচালক, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা, গত সেপ্টেম্বরে একটি বিস্ফোরক পরীক্ষা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সম্ভবত নিউইয়র্কের কোনো স্থাপনায় তাঁর হামলার পরিকল্পনা ছিল। নাজিবুল্লার জন্ম আফগানিস্তানে হলেও বেড়ে ওঠা পাকিস্তানে।
লক্ষণীয় হলো, সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে যেসব মার্কিন তরুণের নাম আসছে, তাঁরা সবাই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত তা নয়। ডেভিড সি হেডলি নামে শিকাগোর এক মার্কিন তরুণের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বাইয়ে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে এ সপ্তাহে। জানুয়ারিতে ব্রায়ান্ট এন বিনাস (২৬) নামে এক হিস্পানিক আমেরিকান, (ইসলাম ধর্মান্তরিত) ২০০৮ সালে পাকিস্তানে আল-কায়েদার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বলে দোষ স্বীকার করেন। আর ড্যানিয়েল পি বয়েডের বিরুদ্ধে অভিযোগ তো আরও গুরুতর। নর্থ ক্যালিফোর্নিয়ার এই শ্বেতাঙ্গ মুসলিম (ধর্মান্তরিত) এই গ্রীষ্মে কোয়ানটিকোতে মার্কিন সেনা কর্মকর্তাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেন। ২০০৬ সালে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধের পরে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যান এবং সাতজনের একটি দলের নেতৃত্ব দেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ করেন বলে অভিযোগ আছে। কিন্তু তিনি কবে, কাদের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন, তা স্পষ্ট হয়নি।
এরপর উল্লেখ করতে হয় গত মাসে টেক্সাসের ফোর্ট হুডে সেনাবাহিনীর মেজর নিদাল এম হাসানের কাণ্ডের কথা। তাঁর এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন ১৩ জন সহকর্মী।
সোমালিদের নিয়ে ভয়: সোমালি-আমেরিকানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ এই মুহূর্তে কোনো অংশে কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রে যেসব সোমালি অভিবাসী হয়ে এসেছে, তাদের অধিকাংশই এসেছে গত ১০ বা ১৫ বছরের মধ্যে। তাদের প্রধান অংশটা বয়সে তরুণ ও দরিদ্র। এই তরুণদের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্ষুব্ধ। ২০০৬ সালে মার্কিন-সমর্থিত ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী সোমালিয়ায় একটি ইসলামি সরকারকে উচ্ছেদ করে। মিনেসোটার ২০ জন সোমালি-আমেরিকান যুবক ওই সময় সোমালিয়ায় গিয়ে ইসলামি সরকারের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্যমতে, সোমালি-আমেরিকানদের মধ্যে ৬০ শতাংশ গিয়েছে ২০০০ সালের পরে এবং এদের ৫১ শতাংশই দরিদ্র। দারিদ্র্য তাদের চরমপন্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। ‘গত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে যারা আমাদের দেশে এসেছে, তাদের ওপর আমাদের কঠোর নজর রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে সোমালি ও পাকিস্তানিদের ওপর আমাদের নজরটা বেশি দিতে হচ্ছে।’—বলছিলেন সদ্য অবসরে যাওয়া সিআইএর বর্ষীয়ান কর্মকর্তা এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা চার্লস অ্যালেন।
মার্কিন মুসলিমদের ভূমিকা: এ অবস্থায় মার্কিন কর্তৃপক্ষের আশার জায়গাটা হলো মুসলিম কমিউনিটি নেতাদের ইতিবাচক পদক্ষেপ। সন্ত্রাসবাদ দমনে তাঁরা সরকারকে সহযোগিতা করছেন। মিনেসোটা ও ভার্জিনিয়ার ঘটনায় অভিভাবক ও কমিউনিটি নেতারা তাঁদের পরিবারের তরুণ সদস্যদের নিখোঁজ হওয়ার কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের পরিচালক হ্যারিস তারিন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইমাম ও কমিউনিটি নেতারা সন্ত্রাসবাদের বিপদ সম্পর্কে অবগত। তাঁরা তরুণদের আচরণ পরিবর্তনের জন্য কাজ করছেন, যদিও কাজটা সহজ নয়। ‘কিন্তু আমরা কী করতে পারি, যদি ইন্টারনেট ও সাইবার স্পেসগুলোতে জঙ্গিবাদের আদর্শ প্রচার করা হয়!’ অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন তারিন। তাঁর মতে, ইন্টারনেট বিভ্রান্ত যুবকদের ‘আদর্শগত বিস্ফোরক’ সরবরাহ করছে, যদিও এসব তরুণের হামলা পরিচালনার মতো কোনো প্রশিক্ষণ নেই, নেই কোনো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও। তবে কমিউনিটি নেতারা কোনো অভিযুক্ত তরুণকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন না।
২০০৭ সালে পিউ রিসার্স সেন্টারের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিমদের অধিকাংশই ‘সিদ্ধান্ত নিয়ে আমেরিকান’ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রভাবিত করেছে বাড়তি আয়, উন্নত শিক্ষা এবং ভালোমতো জীবনযাপনের সুযোগ। এর মধ্য দিয়ে বৃহত্তর অর্থে তারা চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, যা ইউরোপের মুসলিমদের মধ্যে ততটা নয়।
তার পরও: তার পরও সিআইএ সতর্ক। তাদের কাছে তথ্য আছে, যেসব মার্কিন মুসলিম তরুণ দেশের বাইরে যুদ্ধে গেছেন, তাঁদের অনেকে এখন ‘নিজ দেশে যুদ্ধ’ করতে চান। পর্যবেক্ষকদের মতে, আরও ৩০ হাজার সেনা পাঠিয়ে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমানোর চেয়ে নিজ দেশের এসব তরুণকে দমানো বেশি কঠিন।

পাতাটি ৩৬৫ বার প্রদর্শিত হয়েছে।

সংগ্রহকারী:

 মন্তব্য করতে লগিন করুন